Loading...
You are here:  Home  >  কলকাতা  >  Current Article

অরিজিৎদা পারে, আমি কেন পারি না!

By   /  April 22, 2015  /  No Comments

কোনও এক শহরের কোনও এক নগর কোটাল। নাম অরিজিৎ করকায়স্থ। নানা বিষয়ে তিনি পারদর্শী। তাঁর সঙ্গে নিজের অনেক মিল। এক, দুই করে দশ দফা মিলের কথা লিখলেন রবি কর।।

 

গর্বে বুকটা ফুলতে ফুলতে ফেটে যাচ্ছে গো দাদা। এতদিনে কেউ একজন কর বংশের মুখ উজ্জ্বল করল। আমার বউয়ের পদবী সেন। সে নিজেকে রূপে সুচিত্রা, গুনে অমর্ত্য, অর্থে সুদীপ্ত বলে মনে করে। আর আমার পদবী কর। এই পদবীতে ত্রিভুবনে কোনও বিখ্যাত লোক নেই। লেখক বিমল কর, ভাস্কর চিন্তামণি কর, রাজনীতিক ননী কর, ডাক্তার অশোক কর- জীবিত-প্রয়াত মিলিয়ে এরকম কিছু ‘কর’ থাকলেও আমবাঙালি তাঁদের সেভাবে চিনল কই! তাই অরিজিৎদা যখন নগর কোটার হলেন, তখন গর্বে বুকটা ফুলে উঠেছিল। অরিজিৎদার পদবীও আমার মতোই কর। জাতে কায়স্থ। লোকে বলে অরিজিৎ করকায়স্থ। ইনি নগরকোটাল হওয়ার পর থেকেই বউয়ের গলার জোর একটু কমেছিল। আর সেদিন যা হল, তাতে বউয়ের মুখে চুনকালি। দিদি বলে দিয়েছেন, নগররক্ষীরাই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ। তা নগররক্ষীরা তো নগর কোটালের আন্ডারেই কাজ করে। তার মানে তো অরিজিৎ করকায়স্থই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ।

ধন্য, অরিজিৎদা, ধন্য। কর বংশ ধন্য। আপনি আমার হীনমন্যতা দূর করে দিলেন। এবার বুক ফুলিয়ে বলতে পারব, আমিও ‘কর’ বংশের লোক। লতায় পাতায় আত্মীয়তাও খুঁজে নেব।

একইসঙ্গে আফশোসও হল, জানেন! ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়ার জন্য যে যে গুণ লাগে, মানে অরিজিৎদার যে যে গুণ আছে, সে সবই আমারও ছিল। শুধু সময়ে কাজে লাগাতে পারলাম না। আসুন, একনজরে দেখে নিই, ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়ার জন্য কী কী গুণ লাগে।

১) বেঙ্গল টাইমসের এডিটর আমাকে প্রায়ই বলেন, রবিবাবু, চারিদিকে এত খবর, এত ঘটনা, আপনি কি চোখে দেখতে পান না ? কানে শুনতে পান না ?

এটাই ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়ার প্রধান গুণ। দেখতে না পাওয়া, শুনতে না পাওয়া। কে বোম মারল ? আমি তো দেখিনি। কে হুমকি দিল ? আমি তো শুনিনি। সাধারণ মানুষ দেখছে, মিডিয়া দেখছে। শুধু অরিজিৎ করকায়স্থ দেখেননি। এটা সামান্য প্রতিভা নয়, রীতিমতো অনুশীলনের প্রয়োজন।। প্রতিদিন নিজেকে নিজেই বলতে হয়, কোটাল মশাই, আপনি কিন্তু কিছুই দেখেননি।

surajit5

২) ধরুন, হরিমোহন ক্লাবে ভোট হচ্ছে। এক সেপাই গুলি খেয়ে মরে গেল। তখন কোটাল সাহেব এমন হাবভাব করবেন, গেছে তো গেছে। একটা মরে গেছে, এখনও কত হাজার জ্যান্ত আছে। মরা সেপাইয়ের মেয়েকে চাকরি দিলে তো হল।

আমার মনোভাবও অনেকটা এইরকম। এডিটর বলেন, ও রবিবাবু, সারাদিনে মেরেকেটে দুশোটা শব্দ লিখলেন, তার মধ্যে আশিটা বানান ভুল! আমি মুখের উপর বলে দিই, একশো কুড়িটা বানান যে ঠিক আছে, সেটা তো বলেন না।

এত মিল, তবু আমি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হতে পারি না।

৩) এডিটরের কাছে যতই ফটফট করি। বাড়িতে বউয়ের কাছে আমি কেঁচো। বউ যখন ক্ষেপে গিয়ে রান্নাঘর থেকে হাতাখুন্তি ছোঁড়ে, আমি তখন খাটের তলায় লুকাই।

অরিজিৎ করকায়স্থর বাহিনীও তেমন। দিদির বোনঝির মেজো ননদের খুড়শ্বশুরের দলবল কোতোয়ালিতে হল্লা করতে এল। সেপাইরা হাতে ফাইল নিয়ে টেবিলের তলায় ঢুকল। অরিজিৎদা গেলেন দিদির বাড়িতে সিন্নি খেতে।

৪) লক্ষ্মীপুজোর আলপনা দিতে গিয়ে বউ হিজিবিজি দাগ কাটে। আমি মনে মনে জানি, ওগুলো আলপনা হয়নি, কাটাপোনা হয়েছে। কিন্তু মুখে বলি, ওহ্ যা এঁকেছো, সাক্ষাৎ অবনীন্দ্রনাথ।

অরিজিৎ করকায়স্থও তাই করে। দিদি ছবি আঁকলে পাশে বসে এমন বিহ্বল চোখে তাকিয়ে থাকে, যেন মোনালিসা আঁকা হচ্ছে। মনে মনে কী বলেন, তিনিই জানেন!

৫) বেঙ্গল টাইমসের শিরোনামে কী কী খবর যাবে, তা নিয়ে এডিটর আর মালিকের মধ্যে রোজ চুলোচুলি হয়। আমি ছাড়া অফিসের সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। কাউকে না পেয়ে দুজনেই আমার মতামত চায়। আমি কখনও নিজের মতামত দিই না। এডিটরকে কাঁচাকলা দেখিয়ে সাফ জানিয়ে দিই, মালিকের যা মত, আমারও তাই মত।

অরিজিৎ করকায়স্থও তাই করেন। রূপালিদির মিটিংয়ে কারা যেন দিদির পতাকা টাঙিয়ে দিয়েছিল। রূপালিদি সেগুলো খুলে দিয়েছে। প্রথমে অরিজিৎদা কোনও মতামত দেয়নি। যেই মালকিন বলল, রূপালিকে কেন ফাটকে পোরা হবে না, অমনি দাদা বলল, রূপালিদির দোষ।

suraji3

৬) একটা ব্যাপারে অবশ্য আমি পিছিয়ে পড়েছি। দিদির বাড়িতে দিদির বাড়িতে সত্যনারায়ণের সিন্নি দেওয়া হলেই অরিজিৎদা জুতো খুলে, টুপি সামলে হাজির। দিদি জগদ্ধাত্রী পুজো উদ্বোধনে যাবেন। সঙ্গে যাবে হুলো বেড়াল, থুড়ি অরিজিৎদা, কোমর বেঁধেছে। দিদি বলে দিলেন, যেখানে আমি উদ্বোধন করতে পারব না,সেখানে নগর কোটাল উদ্বোধন করবে।

আমার দাদা এমন সুযোগ হয় না। বউ আমাকে কর্মদক্ষ বলে মনেই করে না। তবে এখানেও মিল আছে। বউ মাঝে মাঝে হুকুম করে, আমি রান্না করতে করতে পারব না, তোমাকেই করতে হবে। তখন অরিজিৎদার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই।

৭) শুধু কি বাড়িতে ? অফিসেও কেউ আমাকে কর্মদক্ষ বলে মনে করে না। ছোটবেলায় শুনেছিলাম, ‘জানি না’ বলার মধ্যেও একটা সততা আছে। দেওয়ালে ‘সততার প্রতীক’ দেখে দেখে আমারও তো মাঝে মাঝে সৎ হতে ইচ্ছে করে! আমাকে এডিটর কিছু জিজ্ঞেস করলে বলি, এমন খবর আমার কাছে নেই।

করকায়স্থবাবু আবার আমার থেকেও বিনয়ী! জানলেও বলেন, জানি না। গিরিশবাবুর বাগানে একজন সেপাই গুলি খেল। দেশ দুনিয়ার সবাই জেনে গেল। করকায়স্থদা গন্ধ শুঁকে টের পেল, গুলিতে ঘাসের গন্ধ আছে। সটান বলে দিলেন, এমন গুলি খাওয়ার খবর আমার কাছে নেই। এই গন্ধবিচারটাই হল আসল কথা। গন্ধ শুঁকে কাদের গুলি বুঝতে পারেন বলেই তিনি ম্যান অফ দ্য ম্যাচ, আর আমি রবি কর।

৮) গন্ধবিচারের মতোই গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল আত্মসম্মান বিসর্জন দেওয়া। বউ যখন লোকজনের সামনে বলে, ‘তোমার কোনও মুরোদ নেই’, আমারও খারাপ লাগে। কিন্তু মেনে নিতে হয়। বউয়ের কাছে এটুকু তো হজম করতেই হয়। সবসময় মান সম্মান নিয়ে কি ধুয়ে জল খাব!

 

অরিজিৎ করকায়স্থর দলবলের কোনও মান সম্মান নেই। আজ ফুটবলার চড় মারছে, কাল শ্রমিকনেত্রী চড় মারছে, পরশু আবু মারছে। চড়ে চড়ে চচ্চড়ি করে দিচ্ছে। দিদি তো ভরা বইমেলায় চাবকে সিধে করার হুমকি দিল। তবু বলতে হয়, ইয়েস ম্যাডাম।

surajit2

৯) সেদিন কাজের মেয়েটাকে আমার বউ খুব বকছে। বউ নাকি তাকে সাতবার ফোন করেছে, পায়নি। মেয়েটা ব‌লতে চাইল, তার ফোন তো খেলাই ছিল, ফোন আসেনি। ব্যাস, গিন্নি ক্ষেপে গেল, তবে কি আমি মিথ্যে বলছি! তোর রবি দাদাকে (মানে, আমাকে) জিজ্ঞেস কর।  তারপরেই কটমট করে আমার দিকে তাকিয়ে, ‘কী গো, আমি ওকে সাতবার ফোন করিনি?’ আমি তো কাল সারাদিন বাড়িতেই ছিলাম না। কী করে জানব ফোন করেছে কিনা! কিন্তু সে কথা বলি কী করে! বউকে সায় দিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ, করেছো তো। আমার সামনেই তো করলে।’

অরিজিৎদাকেও তাই করতে হয়। সেদিন স্টেজের মাঝে দিদি বলে দিলেন, এই তো নগর কোটাল আছেন, জিজ্ঞেস করুন, আমি ঠিক বলছি কিনা। নগর কোটালকেও ‘হীরক রাজার দেশে’র মতো মাথা নেড়ে বলতে হল, ঠিক ঠিক।

১০) তবে অরিজিৎদার অনেক প্রতিদ্বন্দ্বীও আছে। কেউ ব্যাঙ্কের লকার থেকে দুর্নীতির ফাইল লোপাট করে। কেউ অম্বিকা মহাপাত্রকে তুলে এনে মারে। কেউ ‘পুলিশকে বোম মারুন’ হুমকি শুনেও গলায় ঢোল ঝুলিয়ে হাততালি দেয়। অরিজিৎদাকে রোজ এদের সঙ্গে কম্পিটিশন করতে হয়।

আমারও কি প্রতিদ্বন্দ্বী নেই ভাবছেন! এই তো পাশের বাড়ির ঘোষবাবু, সে দেখলাম আমার বউকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়ে বসে আছে। নানারকম ছবি পাঠিয়ে আমার বউকে ইমপ্রেস করার চেষ্টা করে। সেই সঙ্গে আমি অফিসে ঘুমোচ্ছি, এমন একটা ছবিও ট্যাগ করেছিল। আমার নম্বর না কমলে যে ওর নম্বর বাড়বে না।

 

তবে একটা ব্যাপারে আমি অরিজিৎদার থেকে এগিয়ে আছি। অরিজিৎদার বউ দিদিকে ছেড়ে নরেন মুদির দলে নাম লিখিয়েছে। কাগজে মাঝে মাঝে ছবিও বেরোয়। কিন্তু আমার বউ যতই দজ্জাল হোক, আমাকে ছেড়ে যায়নি।

এই ব্যাপারটায় অরিজিৎদার নম্বর একটু কাটা গেছে। তবে বিশ্বাস নেই, অরিজিৎদা নম্বর বাড়িও নিতে পারে। বিধানসভার আগে হাতে ঘাস তুলে নিয়ে তাঁর বউ বলতেই পারে, উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে সামিল হলাম। ব্যাস, অরিজিৎদার নম্বর আবার বেড়ে যাবে।

আমিও সেলিব্রিটি নই, আমার বউও তাই সেলিব্রিটি নয়। সে ঘাস নিল, না পদ্ম নিল, তাতে কারও কোনও আগ্রহ নেই।

তাই যতই মিল থাক, ম্যান অফ দ্য ম্যাচ হওয়া আর হল না। আমি রব নিষ্ফলের, হতাশের দলে। তবে ‘কর’ বংশের মুখ তো উজ্জ্বল হল। এটাই বা কম কী ?

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

three + 14 =

You might also like...

radio3

না বোঝা সেই মহালয়া

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk