Loading...
You are here:  Home  >  কলকাতা  >  Current Article

আন্তর্জাতিক নারী দিবস ও কিছু প্রশ্ন

By   /  March 8, 2017  /  No Comments

অম্লান রায়চৌধুরী

যেখানে সারা পৃথিবী নারী মুক্তির আন্দোলনে মাতছে আজকের এই আন্তর্জাতিক নারী দিবসে, তখন আমাদের দেশে এখনও সতীত্ত্বর পরীক্ষা দিতে হয় নারীকে বিয়ের দিন অথবা বিয়ের আগে। এটা একটা উৎসব ভারতের কিছু অঞ্চলে, যেখানে বিয়ের রাতে স্বামী স্ত্রীকে সঙ্গমে রেখে, দেখা হয়, বাইরে বসে অপেক্ষা করা হয়, বিছানায় রক্তের দাগ পড়ে কিনা। রক্তের দাগটাই মেয়েটাকে সতীত্ত্বের পরীক্ষায় পাশ করায়। না হলে বিয়ে বরখাস্ত। মেয়ে ফিরে যায় নিজের বাড়িতে। সতীত্ত্বের পরীক্ষার শুরু সেই রামায়ণের কাল থেকে, এখনও ঘোচাতে পারিনি। পুরুষের সন্দিহান চাউনি, সমাজপতিদের ইচ্ছা, কতটা কদর্যভাবে রুপায়ণ হয় দেখা গেল উপরে শুধু একটি ঘটনার বিবৃতিতে।
রাষ্ট্রসংঘ W H O’ র মারফত এগুলোকে নিষিদ্ধ করবার জন্য বিভিন্ন রকমের আইন পাশ করেছে, কিন্তু আমরা এখনও ততখানি সভ্য হইনি যে ওগুলোকে প্রশাসনিক স্তরে নিয়ে এসে বাধা সৃষ্টি করতে পারি। তাই সেই বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে।

আজকেও নারীর অবস্থান এই জায়গায়। ধর্ষণ কথাটা এখন বহুল প্রচারিত। ধর্ষণ মানে ইচ্ছা অনিচ্ছার বিবাদের ফল। অনিচ্ছুক মানেই ধর্ষিতা। এই ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজটাকে আমরা নানান ভাবে দেখতে দেখতে এমন একটা স্তরে নিয়ে ফেলেছি যে ধর্ষণ হারিয়ে ফেলেছে তার আসল গুরুত্ত্বটা। ফলে যে ধর্ষিতা তাকে নিয়ে কেউ আর ভাবছে না, শুধু ভাবছে ধর্ষককে নিয়ে। যদি সেই ধর্ষকের কেউ না থাকে বাঁচাবার । ফলে আশ্রিত ধর্ষকরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায় । লোকলজ্জা বা সমাজ কাউকেই তোয়াক্কা করে না । কারণ আমরা ধর্ষিতার প্রতি মমত্ত্ববোধ আনতে শিখিনি, বুঝতে শিখিনি , সাহস জোগাতে শিখিনি। যদি শিখতাম ধর্ষক শত আশ্রিত হলেও ভীত হত, বুঝত সমাজে তারই কৃতকর্মকে তোয়াক্কা করছে না । উপরন্তু সমাজ একটা এমন বাতাবরন তৈরি করছে যে পরবর্তিকালে ধর্ষকরাও সমীহ করতে শিখবে এই অবস্থার ।

womens day3
ধর্ষক কেন হয়, বাকি কি অবস্থায় হয়, এ সবই গভীর সমাজতাত্ত্বিক আলোচনার মধ্যে পড়ে– এখানে এর পরিসর নেই বিস্তৃত আলোচনার– তাই করা হল না। তবে এটা বোধ হয় বলা যায় ধর্ষক–‌কূল কিন্তু মদতপুষ্ট, ভয়হীন, অথবা প্রশাসনের খেলাঘর শাসন প্রকল্পটার ফাঁকফোকর গুলো সম্বন্ধে অবহিত। এতগুলো অবস্থা লাগে ধর্ষক হতে গেলে, আশ্চর্য যেগুলো খুব সহজেই আজ পাওয়া যাচ্ছে আর ক্রমাগত বাড়ছেও।
ধর্ষক হয় নানান জাতের, ধর্ষিতার খুব চেনা, অচেনা– দলবদ্ধভাবে, অথবা কারুর ক্ষোভের প্রকাশের বোরে । কাজেই অধিকাংশক্ষেত্রেই ধর্ষিতার পক্ষে বোঝাই সম্ভব হয় না যে কেন সে ধর্ষিতা হল। অপরের, মানে সমাজের সাহায্য ছাড়া তার পক্ষে এই বিষয়টাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। কাজেই অধিকাংশ ধর্ষণই নথিভুক্ত হয় না পুলিশের কাছে। একা যেখানে অপারগ, সমাজ এই কাজটা করতে পারে অবলীলায় । অথচ সমাজ কিন্তু পাল্টায়নি, ধর্ষকের সংখ্যা বেড়েছে , সমাজের সামাজিকতা কমেছে , দলবদ্ধতা কমেছে , সন্দেহ বেড়েছে, বিশ্বাস কমেছে। ধর্ষিতার ভাগ্যে জুটছে কাছের মানুষের অনুকম্পা, সমাজের সন্দিহান প্রশ্ন, সমাজপতিদের শাসানি, আশ্রিত ধর্ষকের চোখরাঙানি–হুমকি–মেয়েটাকে অবশ করে দিচ্ছে । সে তার গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে, সমাজে গ্রহনযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারিত হচ্ছে এখনও ঠাকুমা- দিদিমাদের বানানো স্তম্ভে। পরিবর্তনটাকে মানছে না, অবস্থাটাকে ব্যাখ্যা করছে না। মেয়েটি এদিকে বোবা হয়ে যাচ্ছে , ঘরে ও বাইরে। বাঁচার পথ খুঁজছে আত্মহননের – ঘটছেও অহরহ। দায়ী কে ? আমরাই ।

womens day2
এই প্রসঙ্গে একটা ছোটো ঘটনা মনে পড়ল। ঘটনাটি ঘটেছে তানজানিয়াতে । ওখানকার কোনও এক গ্রামের একটি মেয়ে লোয়ার স্কুল পাশ করে হাইস্কুলে ভর্তি হল। ওর খুব ইচ্ছা আরও পড়বে, কলেজে পড়বে, উচ্চশিক্ষা নিয়ে বিদেশে গিয়ে পড়াশুনা করবে, দেশে ফিরে উচ্চপদস্থ চাকরি করবে। হাইস্কুলের নিয়ম আছে ওদেশে, প্রত্যেক সপ্তাহে মেয়েদের প্রেগনেন্সি টেস্ট করতে হবে, কোনও মেয়ে প্রেগনেন্ট হলে, স্কুল ছাড়তে হবে, সমাজ ব্যবস্থা নেবে। হয় জোর করে বিয়ে অথবা অন্য বিধান। মেয়েটির এক গৃহশিক্ষক রাখা হল, বাবারই পরিচিত গ্রামের এক মোড়লের ছেলেকে। একদিন ছেলেটি ঘরেই বাড়ির সবার অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে মেয়েটিকে ধর্ষণ করল। মেয়েটি প্রেগনেন্ট হয়ে পড়ল। বাবার ক্ষমতার মধ্যে শুধু ছেলেটিকে আর পড়াতে বারন করল, এর বেশি কিছু করার সাহস ওর বাবার ছিল না– তাহলে হয়ত সমাজ চ্যুত হতে হবে। মেয়েটি প্রেগনেন্ট টেস্টে পাশ করল না। পেল না নিজের অনিচ্ছার বিচার। সারাজীবনের স্বপ্ন মূহূর্তে মিলিয়ে গেল। আজ মেয়েটি গৃহবন্দী, নীরেনবাবুর অমলকান্তির মতন রোদ্দুর দেখার সাধও বোধ হয় হয় না আর ওর ।
এভাবেই চলছে। নারী স্বাধীনতায় আমরাও অনেক অর্জন করেছি, কিন্তু তবুও এই ব্যাথাগুলো বড় লাগে, প্রশ্ন করে কতটা এগোলে এই ব্যথা দূর করা যাবে। শুধু ধর্ষণ বা নারী নির্যাতন রোখা নয়, যে ধর্ষিত বা অবহেলিত তাকেও দিতে হবে মর্যাদা। তার গ্রহণযোগ্যতা নিয়ে সমাজ কোনও প্রশ্ন করবে না, তবে না ধর্ষক বুঝবে যে সমাজ জেগেছে, দলবদ্ধ হচ্ছে, প্রতিবাদের একটা আশঙ্কা আছে । এ সমস্তকে উপেক্ষা করার সাহস হয়ত বা আশ্রিত ধর্ষকরাও দেখাবে না, কারণ এখানে এখনও মানুষই স্তম্ভ বানায়, আশ্রিতরা তো ওই স্তম্ভেরই শাখা প্রশাখা। এই অবস্থাটাই চাই, এটাই হোক আজকের নারী দিবসের অঙ্গীকার ।
এখনও পুরুষশাসিত সমাজেরই আধিপত্য। কারণ, তারা বলশালী। দৈহিক ও ক্ষমতা উভয় বলই চাপ সৃষ্টি করে। দৈহিক থেকে ক্ষমতার বদলটাই সব থেকে মারাত্মক। না হলে রুপকানোয়ার কথা তৈরি হয় না। আসলে ক্ষমতা সবসময়ই অন্যের ক্ষমতার বিচার করে। রাজার রাজ্য দখল ও আজকের পাড়া দখলের মূলগত কোনও পার্থক্য নেই – দুটোই ক্ষমতা দখলের দোষে দুষ্ট। সমান্তরাল ক্ষমতা সৃষ্টি করাই হোক নারী স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য। আজকের দিনের সব চাইতে প্রধান কাজ ।
যেদিন এগুলোর কিছুটা নিরসন হবে, আমাকে আর এই বিষয়ে লিখতে হবে না। সেদিনই পারব আমি নারী দিবসকে কাছে টানতে, কারণ এই প্রত্যেকটা বছরের এই দিনটি হল এই দিবসের পরীক্ষার দিন, মূল্যায়নের দিন। এখনও পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়াটা অনেক দূরে। ততদিন খালি আমরা যুক্ত থাকি নিজেদেরকে শুদ্ধিকরণের প্রক্রিয়াতে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

two + three =

You might also like...

radio3

না বোঝা সেই মহালয়া

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk