Loading...
You are here:  Home  >  কলকাতা  >  Current Article

খেলার মাঠ সত্যিই আক্রান্ত

By   /  December 13, 2014  /  No Comments

স্বরূপ গোস্বামী

হীরক রাজার দেশের একটা দৃশ্য মনে পড়ে যাচ্ছে। গনৎকার দেখছেন, হীরক রাজার সমূহ বিপদ। কিন্তু এই সত্যি কথাটা তাঁকে বলবেন কীভাবে? বেশ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছিল গনৎকারকে। মহারাজ জিজ্ঞাসা করলেন, কার সঙ্কট ? গনৎকার কী বলবেন, ভেবে পাচ্ছিলেন না। পরে বললেন, হীরকের যে সবথেকে বড় শত্রু, তার। মহারাজ শুনে বেজায় খুশি। যাক, তাঁর কোনও বিপদ নেই। কিন্তু হেঁয়ালির মোড়কে আসল সত্যিটা সেদিন বলেই ফেলেছিলেন গনৎকার।

তৃণমূলের ডাকে আজ কারা মিছিলে হাঁটবেন, তা নিয়ে এখনও জল্পনা চলছে। মিছিলের ফেস্টুনে নিশ্চয় লেখা থাকবে খেলার মাঠ আক্রান্ত। আর সেটা বুকে নিয়েই হাঁটবেন একসময়ের দিকপাল ক্রীড়াবিদরা। তাঁদের হাঁটতে দেখে হীরকরাজের সেই গনৎকারের কথাটাই মনে পড়বে। তৃণমূলের ডাকে মিছিলে হেঁটেও আসল সত্যিটা তাঁরা বলেই ফেলবেন। এক সপ্তাহ আগে নন্দন থেকে অ্যাকাডেমির সেই মিছিলে টলিউডের কলাকুশলীরা বলেছিলেন, সংস্কৃতি আক্রান্ত। সেদিনও তাঁরা সত্যি কথাটাই বলেছিলেন। সংস্কৃতি সত্যিই আক্রান্ত। তৃণমূলের শিবিরে নাম না লেখালে সিনেমা বা সিরিয়ালে কাজ পাওয়া যাবে না। তৃণমূলের সভায় না গেলে বা মিছিলে না গেলে ইন্ডাস্ট্রি থেকে কার্যত হারিয়ে যেতে হবে। এমনকি চিটফান্ড কেলেঙ্কারির নায়কদের বাঁচানোর দাবিতে মিছিল হলে, তাও যেতে হবে। শুটিংয়ের জন্য দার্জিলিং গেলেও, শুটিং ক্যানসেল করে তড়িঘড়ি ফিরে আসতে হবে। কোনও যুক্তি নেই, মিছিলে আসার এতটুকু ইচ্ছে নেই, ক্যামেরার সামনে মুখ দেখালে অস্বস্তি, বাড়ির লোক- আত্মীয়রা হাসাহাসি করবেন, এটা জেনেও মিছিলে হাঁটতে হবে। সত্যিই, সংস্কৃতি আক্রান্ত। কী সত্যি কথাটাই না ওঁরা বলেছিলেন।

আজ সেই সত্যিটাই বলতে চলেছেন ক্রীড়াবিদরা। একসময় এঁরাই ময়দান কাঁপাতেন, বুক চিতিয়ে লড়াই করতেন, মাথা উঁচু করে কর্তাদের নানা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন। আজ তাঁদেরই মুখ নিচু করে হাঁটতে হবে। এই গোষ্ঠা পাল মূর্তির পাদদেশ থেকে কত পবিত্র মিছিল হয়েছে। আজ সবথেকে কলঙ্কিত মিছিলটাও শুরু হবে সেই গোষ্ঠ পালের মূর্তি থেকেই। এমন কুন্ঠিতভাবে ওঁরা কখনও মিছিলে হেঁটেছেন ? ইচ্ছার বিরুদ্ধে কখনও এভাবে ‘প্রতিবাদ’ করেছেন ? ওঁরা নিজেরাই মনে করে দেখুন। মঞ্চে উঠে বঙ্গভূষণ নেওয়ার এমন মাশুল দিতে হবে, তা কি ওঁরা কখনও ভাবতেও পেরেছিলেন ?

দুই ক্লাবের দুই কর্তা জেলে। এই আবেগকে কাজে লাগিয়ে দুই বড় ক্লাবকে নামানোর একটা চেষ্টা চলবে। কিন্তু যে দুই কর্তাকে সিবিআই গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা কেউ ক্লাবের জন্য জেলে যাননি। এর পেছনে কোথাও কোনও ফুটবল নেই। তাঁদের জেলে যাওয়া সম্পূর্ণ অন্য কারণে। কিন্তু এই দুই কর্তার কথা বলে দুই প্রধানকে হাজির করার চেষ্টা চলছে কাল বিকেল থেকেই। আর মহমেডান তো ‘ডাকিলেই যাইব’। দাদা সুলতান সাংসদ, ভাই ইকবাল বিধায়ক, মহমেডানকে বোধ হয় ডাকারও দরকার পড়বে না। হয়ত ফুটবলারদেরও হাজির থাকার ফরমান জারি করে বসতে পারে সাদা কালো ব্রিগেড। হকির মাঠ তো মুখ্যমন্ত্রীর ভাই বাবুন ব্যানার্জির দখলে। সচিব বা সভাপতি না হয়েও হকি অ্যাসোসিয়েশনের চেকে সই করার মালিক তিনিই। মুখ্যমন্ত্রীর আরেক দাদা তো আবার বেঙ্গল অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। সব স্মল গেমস তাঁর ছাতার তলায়।

টলিউডিদের রাস্তায় নামানোর ‘মহান’ দায়িত্ব নিয়েছিলেন বাম শিবির থেকে যাওয়া অরিন্দম শীল, ইন্দ্রনীল সেন, সুবোধ সরকাররা। তাঁদের কথায় জমায়েত হওয়ার কথা নয়। তাঁদের না আছে পাইয়ে দেওয়ার ক্ষমতা, না আছে টাইট দেওয়ার ক্ষমতা। তাই আসরে নামতে হয়েছিল কীর্তিমান মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস ও তোতধিক কীর্তিমান শ্রীকান্ত মোহতাকে। এবার কারা আসরে নামছেন ? কয়েকটা নাম ভেসে উঠছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাদা ও ভাই তো আছেনই।  প্রসূন ব্যানার্জি না হয় সাংসদ, তাঁর না হয় দায়িত্ব আছে। বাইচুং ভুটিয়া, দীপেন্দু বিশ্বাস না হয় ভোটে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদেরও না হয় কিছু দায় থেকে যায়। কিন্তু গৌতম সরকার, সমরেশ চৌধুরি, বিদেশ বসুদের তো সেই দায় নেই। তাঁরা সফল করতে এমন উঠেপড়ে লেগেছেন কেন? কী জানি, সাংসদ ভাইয়ের  আমন্ত্রণে দাদা পিকেও হয়ত হাঁটবেন। পিকে স্যার, এমন কলঙ্কিত মিছিলে আগে কখনও হেঁটেছেন। তবু ভাল, চুনী গোস্বামী অন্তত বলতে পেরেছেন ‘আমি রাজনীতি করি না। রাজনৈতিক মিছিলে যাব না।’ সুভাষ ভৌমিক, আপনি ? আগে অরূপ বিশ্বাসের হয়ে প্রচার করেছেন। বেশ করেছেন। পাড়ার ছেলে, অনেকদিনের চেনাজানা। তাঁর হয়ে প্রচার করতেই পারেন। তাই বলে এই মিছিলে ? আপনিও বলবেন সিবিআইয়ের চক্রান্ত ! সুব্রত ভট্টাচার্য এ যাত্রায় বেঁচে গেলেন। শোনা যাচ্ছে, তিনি আছেন কোচবিহারে। অতএব, না আসার জন্য তেমন রক্তচক্ষুর মুখে পড়তে হবে না। ক্রিকেটারদের মধ্যেও নিশ্চয় কাউকে কাউকে দেখা যাবে। সোমা বিশ্বাসকেও নিশ্চিতভাবে মিছিলে দেখা যাবে। দোলা- রাহুল অবশ্য জামশেদপুর যাচ্ছেন, টুর্নামেন্ট আছে। বাকিরা ? অদ্ভুত একটা ভয়ের আবহ যেন কাজ করছে। একসময়ের দাপুটে খেলোয়াড়রা কেউ বলতে পারছেন না, কলকাতায় থাকলেও এমন মিছিলে হাঁটব না ? গৌতম সরকার, আপনাকে এখনও ভারতের বেকেনবাওয়ার বলা হয়। পেলের কসমসের বিরুদ্ধে সেই বুক চিতিয়ে লড়াই, যা স্বয়ং পেলেও মনে রেখেছিলেন। সেদিন মাঠের মাঝে পেলেকে দেখে গুটিয়ে যাননি, আজ মমতার দাদা আর ভাইকে দেখে এভাবে গুটিয়ে যাবেন ? সাহসের জন্যই খেলা ছাড়ার এত বছর পরে আপনাকে মনে রেখেছে বাঙালি। সেই সাহসটাকে এভাবে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবেন ? সুধীর কর্মকার, রিষড়ার এই বেঁটেখাটো মানুষটি কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে, সেটা সত্তর সালে বুঝেছিলেন জাপানের কামামাতো। ছোট্ট সুধীর সেদিন বুক চিতিয়ে লড়েছিলেন, বোতলবন্দী করে রেখেছিলেন কামামাতোকে। সেই সুধীর আজ নিজেই বোতলবন্দী হয়ে যাবেন! বাম জমানায় সুভাষ চক্রবর্তী কয়েকজন ফুটবলারকে বিশ্বকাপ (১৯৯৮, ফ্রান্স বিশ্বকাপ) দেখতে পাঠাবেন ঠিক করেছিলেন। বাকি সবাই গদগদ হয়ে বিমানে উঠে পড়েছিলেন। সেবার ওঠেননি একজন- সুধীর কর্মকার। সেই প্রতিবাদ বাঙালি আজও মনে রেখেছে। সেই ছবিটাকে নিজের হাতে ছিঁড়ে ফেলবেন ?

অবশ্য, অসহায় আত্মসমর্পণটা অনেকদিন ধরেই। যখনই রাজনৈতিক মঞ্চে ডাকা হয়েছে, যেতে হয়েছে। কারণ, ওই যে একবার বঙ্গভূষণ নিয়ে ফেলেছেন। এখন তার মাশুল দিতে হচ্ছে। ভাবতে ভাল লাগছে, একজনই এই প্রস্তাব সবিনয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন – সুরজিৎ সেনগুপ্ত। ঠিক যেমনভাবে ১৯৯৪ এ আমেরিকা বিশ্বকাপ যাওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়েছিলেন। যেমনভাবে স্পোর্টস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। সবাই যখন গদগদ হয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সভায় ভিড় করছেন, অনুদানের টাকা নিচ্ছেন, তখন সেই টাকা ফিরিয়ে দিতে বুকের পাটা লাগে। বছর দুই আগে বুকে মারাত্মক অপারেশনের পরেও দেখা গেল, সেই বুকের পাটা আপনার আছে। নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, এই নির্লজ্জ মিছিলে সুরজিৎ সেনগুপ্তকে দেখা যাবে না।

আরও একজন। শান্তি মল্লিক। তেমনভাবে নাম শোনা যায় না। যতদূর জানি, মহিলা ফুটবলে ভারতের একমাত্র অর্জুন। তাঁর কাছেও ফোন গিয়েছিল। পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, এর সঙ্গে খেলার সম্পর্ক নেই। কলকাতায় থাকলেও এমন মিছিলে হাঁটতে পারব না। প্রচার ও গ্ল্যামার থেকে হাজার মাইল দূরে থাকা শান্তি মল্লিকরা যা পারেন, দিকপালদের সেই মেরুদন্ডটুকুও নেই। শান্তি মল্লিকদের দেখে বাকিরা যদি একটু শিখতেন! কেন আপনিই একমাত্র অর্জুন, এ নিয়ে বিস্ময় ছিল, প্রশ্ন ছিল। আজ আর সেই প্রশ্ন রইল না। আপনার পাশে তথাকথিত ‘অর্জুন’দের বড়ই ম্লান মনে হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 1 =

You might also like...

yeti abhijan

ইয়েতির চেয়ে ঢের ভাল ছিল মিশর রহস্য

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk