Loading...
You are here:  Home  >  রাজনীতি  >  জাতীয়  >  Current Article

ধর্মীয় রাজনীতি ও বামপন্থা

By   /  November 13, 2016  /  No Comments

 

সত্রাজিত চ্যাটার্জি

 

কোথায় যেন পড়েছিলাম ধর্ম মানে হল যা আমাদের ধারণ করে। শুধু ধারণ করে নয়, বৃহত্তর অর্থে যা আমাদের চালন করে। কিন্তু সত্যিই কি তাই ? সত্যিই কি ধর্ম আমাদের শিক্ষা, আমাদের রুচিবোধ,আমাদের সংস্কৃতি,আমাদের সভ্যতা— এসবের ঊর্ধ্বে গিয়ে আমাদের চালন করতে পারে ?

বর্তমান রাজ্য ও দেশীয় রাজনীতিতে ধর্মের একটি বিশাল প্রভাব চলছে। প্রভাব না বলে কুপ্রভাব বলাই উচিত। দেশের সংহতি,দেশের ঐক্যকে ভেঙে চুরে তছনছ করছে এই ধর্ম। ধর্ম বললে ভুল হবে, বরং বলা উচিত ধর্মীয় গোঁড়ামি আর অন্ধবিশ্বাস। পৃথিবীর ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে এই ধর্মীয় গোঁড়ামির ভয়ংকর পরিণতি। একাদশ থেকে ষোড়শ শতকের মধ্যে ইউরোপে ও জেরুজালেমে সংঘটিত  “ক্রুসেড” বা ধর্মযুদ্ধ নামে পরিচিত এই যুদ্ধে সহস্রাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছিলো। ইসলাম ধর্মেও শিয়া ও সুন্নি এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা বিবাদ লেগেই থাকতো এবং সেই বিবাদও ভয়াবহ যুদ্ধের আকার ধারণ করে কারবালার মরু প্রান্তরে। বৌদ্ধধর্মেও “হীনযান” ও “মহাযান” বা জৈনধর্মেও “শ্বেতাম্বর” ও “দিগম্বর” দের মধ্যে আচার,রীতি-নীতি নিয়ে বিবাদ-বিসম্বাদ লেগেই থাকে। বা মহাভারতের যুদ্ধও ধর্মযুদ্ধ নামেই পরিচিত। সেখানেও যুদ্ধ শেষে ধর্মের জয় হল বলেই লেখা হয়েছে। এরকম আরো অজস্র উদাহরণ আছে।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে ধর্মেই হিংসা। ধর্মেই সংঘাত। আর ধর্মেই হানাহানি। আর ধর্মই রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মূল। তাই উগ্র ধর্মান্ধতা কোনভাবেই সুস্থ, সভ্য, সামাজিক সুরুচিসম্পন্ন মানুষকে সঠিকপথের দিশা দেখাতে পারে না।

 

modi mamata

ভারতের বর্তমান শাসক দলের চরিত্রটাও এই ধর্মভিত্তিক রাজনীতি করা। এদের নীতি একটাই । “দেশটাকে “হিন্দুর দেশ” ঘোষণা করা। এরা দেশের সংবিধান মানে না,দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হানতে চায়। এদের দৃষ্টিতে অন্য ধর্মের মানুষ মানেই অবাঞ্ছিতভাবে এদেশে বসবাস করছে। যে কোন মূল্যে তাদের কে ভারতবর্ষ থেকে তাড়াতে পারলেই এদের উদ্দেশ্য সিদ্ধ। “বিবিধের মাঝে দেখ মিলন মহান” এই কথাটা তাদের কাছে অভিশাপের মতই শোনায়। অতীতেও এরা ঐতিহাসিক সৌধ বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ করেছে নিজেদের সাম্প্রদায়িক স্বার্থসিদ্ধির আশায়।বিগত লোকসভা নির্বাচনে প্রায় ৩০০ এর বেশি আসনে জিতে দিল্লির মসনদ দখল করার পরেও তাদের সেই একই ধারা বজায় রয়েছে।এরা এক সম্প্রদায়ের খাদ্যাভ্যাসে বিধি নিষেধ আরোপ করেছে। এদের বিধায়ক-সাংসদরা অহরহ একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের পুরুষ ও নারীদের প্রতি কুরুচিকর মন্তব্য করে চলেছে,সংখ্যাগরিষ্ঠদের বারংবার প্ররোচিত করছে, উসকানি দিচ্ছে সংখ্যালঘুদের ওপর আক্রমণ হানতে।এদের শাসনাধীন রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ইতিহাসের পাঠক্রম থেকে মুঘল যুগের ইতিহাস বাদ দেওয়ার নির্দেশ জারি করেছে এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে তা বলবৎও করা হয়েছে। এদের মন্ত্রী,সাংসদ দের তোপের মুখে পড়েছে অমর্ত্য সেনের মতো নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ থেকে সমাজের আরও বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।এমনকি বিশ্বশান্তির অন্যতম মূর্ত প্রতীক নোবেলজয়ী প্রয়াত মাদার টেরিসাও এদের কুরুচিকর অভিযোগের শিকার হয়েছেন। দেশের বিভিন্ন স্থানে এরা খ্রীষ্টান ধর্মাবলম্বীদের ওপরও আঘাত হানছে।এরা গোয়া তে,ম্যাঙ্গালোরে চার্চ ভেঙ্গে হনুমানের মন্দির প্রতিষ্ঠা করছে। এই উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা গোমাংস বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এবং গোমাংস রাখার বা বিক্রি করার অপরাধে দেশের বহু জায়গায় হোটেল বা রেস্টুরেন্টের মালিক  বা কর্মচারী এদের হাতে প্রহৃত হয়েছে। এদের নেতারা জোর করে বা টাকার বিনিময়ে দেশের নানা স্থানে অহিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ কে  হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত করছে।  আর এইসবের বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ বা উদ্বেগজনক কথা কেউ বললেই তাকে “দেশদ্রোহী” বা “দেশ-বিরোধী” বা “পাকিস্তানের এজেন্ট” ইত্যাদি তকমা দেওয়া হচ্ছে। প্রধান উল্লেখযোগ্য বিষয় এই যে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও পরোক্ষে এইধর্মান্ধদের সমর্থন করছেন অথবা এদের সাম্প্রদায়িক উসকানি এবং ধর্মীয় হিংসার বিরুদ্ধে আশ্চর্যজনকভাবে নীরব থাকছেন। অতীতে তিনি মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন গুজরাতে ভয়াবহ সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল,যাতে তার পরোক্ষ মদত ছিল বলেই ধরে নেওয়া যায়। আর আদালত যদি বা তাকে এই দাঙ্গার নেপথ্যে ইন্ধন যোগানোর ব্যাপারে ক্লিনচিট দিয়েও থাকে,তথাপি যেহেতু তার প্রশাসন ওই দাঙ্গা রুখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ, তাই মুখ্যমন্ত্রী তথা প্রশাসনের প্রধান হিসেবে সেই ব্যর্থতার দায় তার ওপরই বর্তায়। সর্বোপরি বর্তমানে দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েও তিনি বিজ্ঞান কে অস্বীকার করে এবং ইতিহাস ভুলে গিয়ে তাঁর বিভিন্ন ভাষণে হিন্দু ধর্মের দোহাই দিয়ে চলেছেন।

furfura3

অন্যদিকে আমাদের পশ্চিমবাংলাতেও বিগত কিছু বছর যাবৎ ধর্মীয় একটা হিংসার বাতাবরণ তৈরি করেছে শাসক দল। রাজনৈতিক কারণেই তারা সংখ্যালঘুদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিভিন্ন অনৈতিক সুবিধা দিয়ে তাদের একেবারে মাথায় তুলেছে। মুখ্যমন্ত্রী তার দলের কোন সংখ্যালঘু নেতা, যাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ র‍য়েছে যেমন খুন,ধর্ষণ,রাহাজানি,তোলাবাজি ইত্যাদি,অন্যায় ভাবে সেই অভিযোগ খারিজ করেছেন বা সঠিক তদন্তের নির্দেশ না দিয়ে পুলিশ প্রশাসন কে তাদের বিরুদ্ধে নিস্ক্রিয় করে রেখেছেন। শিক্ষিত যুক্তিবাদী মুসলিমরা নন, প্ররোচনা দেওয়া লোকেরাই হয়ে উঠছেন মুসলিম সমাজের মুখ। তার দলের রাজ্যসভার এক সাংসদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠন জামাত এর যোগ থাকার অভিযোগ উঠেছে। এবং দেশের আভ্যন্তরীণ  তথ্য ও সেই সঙ্গে বিপুল পরিমাণ টাকা বাংলাদেশে পাচার করারও অভিযোগ রয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর বিশেষ “আনুকূল্যে” তার পুলিশ প্রশাসন তদন্ত করা তো দূরের কথা,উক্ত সাংসদ কে জিজ্ঞাসাবাদের জন্যও আজ পর্যন্ত একটি বার ডাকেনি। স্বভাবতই অনেকের কাছে এই বার্তাই যাচ্ছে যে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তাদের প্রধান “সহায়”এবং তাদের কোন অপরাধেরই কোন তদন্ত বা বিচার মুখ্যমন্ত্রী চান না রাজনৈতিক কারণে।এবং এর ফলে বেপরোয়া মনোভাবের বলি হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষজনকে। যারা শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মুসলিম, তাঁরা গুরুত্ব পাচ্ছেন না। যেভাবে ধর্মকে নিয়ে রাজনীতি করা হচ্ছে, এতে তাঁরাও নিশ্চয় বিরক্ত। পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তে অবাধে চলছে গরু এবং অন্যান্য গবাদি পশু পাচার। এরা কোথাও অবাধে লুটপাট করছে,কোথাও নারীর ধর্ষণ বা শ্লীলতাহানি,কোথাও বা জোর করে তোলা আদায় এবং সর্বোপরি হিন্দুদের আরাধ্যা দুর্গা প্রতিমা বা কালী প্রতিমা ভাঙা বা বিসর্জনের সময় বিশৃঙ্খলা ও আনাচার সৃষ্টি করা যা বিগত বাম সরকারের আমলে বাংলার মানুষজন কখনও দেখেছিল কিনা সন্দেহ।বাংলায় বিগত বিধানসভা নির্বাচনের আগে সংখ্যালঘু নেতা ত্বহা সিদ্দিকি মন্তব্য করেছিলেন যে ,”বাংলায় কারা সরকার গঠন করবে তার নির্ণায়ক হবো আমরা-(মুসলিমরা)। পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে ৩২% সংখ্যালঘুদের বাস। তথাপি তাদের নেতার এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য বিগত বাম সরকারের আমলে বাংলার মানুষজন আর কোনদিনও শুনেছিল বলে কেউ মনে করতে পারবেন না। ত্বহা সিদ্দিকিরা কি মুসলিম সমাজের ঠিকে নিয়ে রেখেছেন ? তাঁর কথায় কি মুসলিম সমাজ চলবে ? রাজনৈতিক কারণে সংখ্যালঘুদের বাড়তি সুবিধা দেওয়ার সর্বশেষ সংযোজন হল রাজ্যের শাসক দল আদালত প্রদত্ত “তিন তালাক” প্রথার রায়ের বিরোধিতা করে “তিন তালাক” কে সমর্থন করার কথাই বলেছে।

রাজ্য ও দেশজুড়ে দুই শাসক দলের দুই বিপরীতধর্মী  সাম্প্রদায়িক এই রাজনীতির ফলে বাংলাতে এবং ভারতবর্ষের নানা স্থানে যে অরাজকতা ও অস্থিরতা চলছে,এর থেকে পরিত্রাণের পথ একমাত্র বামপন্থা। বামপন্থীরাই পারে এই দেশজুড়ে চলা এই ধর্মীয় অরাজকতা থেকে দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে। বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষ তাই সর্বধর্মের মেলবন্ধনই বামপন্থীদের মূল লক্ষ্য। “বামপন্থীরা ধর্মনিরপেক্ষতার পক্ষে, কিন্তু ধর্মহীনতার পক্ষে নয়। অর্থাৎ নিজ নিজ ধর্মে বিশ্বাসী যারা,তাদের স্বীয় ধর্মীয় আচার বিচারে বামপন্থীদের কোন আপত্তি নেই। তবে বলপূর্বক বা টাকার বিনিময়ে এক ধর্মের মানুষকে অন্য ধর্মে দীক্ষিত করা একটি অপরাধ শুধু নয়,একটি সামাজিক ব্যাধিও বটে। তাই বামপন্থীরা বরাবরই এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিল এবং রয়েছে। আবার বামপন্থীরা কোন বিশেষ একটি ধর্মের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট নয়। তাই ইন্দিরা গান্ধী হত্যার পরে সারা দেশ ব্যাপী যে শিখ নিধন যজ্ঞ শুরু করেছিল কংগ্রেসিরা, বাংলায় তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু কয়েক হাজার শিখদের আশ্রয় দিয়ে তাদের রক্ষা করেছিলেন। আবার ২০০২ সালে ভয়াবহ গুজ়রাট দাঙ্গার সময়ও বামপন্থীরা কুতুবুদ্দিন আনসারি ,যার করুণ,ক্ষমাপ্রার্থী মুখের ছবি সেই সময় দেশব্যাপী প্রায় প্রতিটি দৈনিকেই ছাপা হয়েছিল তাকেও আশ্রয় দিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গে। বাম সরকারের ৩৪ বছরের শাসনাধীনের বাংলার কোথাও একটা মন্দিরও ভাঙা হয়নি, বা একটা মসজিদও ভাঙা হয়নি। সুতরাং এই ঐক্য,এই অখণ্ডতা,সর্বধর্মের এই মেলবন্ধন ও সম্প্রীতি একমাত্র বামপন্থীরাই বজায় রাখতে সক্ষম।

তাই বর্তমান বাংলা তথা ভারতবর্ষের ধর্মীয় এই হিংসা , প্ররোচনা, অরাজকতার  বিরুদ্ধে প্রতিটি বামপন্থী দলের নেতৃবৃন্দ,কর্মী ও সমর্থক এবং বামপন্থী সকল সাধারণ মানুষেরই একজোট হয়ে সর্বাত্মক আন্দোলনে আশু সামিল হওয়া ও দেশবাসীকে সচেতন করা অতি আবশ্যক। তবেই ধর্ম কেন্দ্রিক সব হিংসা,অনাচার ও হানাহানির রাহু মুক্ত হবে এবং বিশ্বের দরবারে ভারতবর্ষ বিবিধের মাঝে মহমিলনের ক্ষেত্র রূপে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × two =

You might also like...

taxi

হাওড়া স্টেশন নিয়ে প্রশাসনের হেলদোল নেই

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk