Loading...
You are here:  Home  >  খেলা  >  Current Article

পাঁচ গোলের মলম দ্রুততম গোলে!

By   /  October 26, 2015  /  No Comments

ঠিক ৪০ বছর আগে। মোহনবাগানকে পাঁচ গোল দিয়েছিল ইস্টবেঙ্গল।স্কোরটা অনেকেই জানেন। কিন্তু তার ঐতিহাসিক পটভূমি? সেদিকে আলো ফেললেন ক্রীড়া গবেষক ড. শুভ্রাংশু রায়।।

তৎকালীন সময়ে কলকাতা বা কলকাতার বাইরের এমন কোনও বাঙালিকে খুঁজে পাওয়া বোধহয় প্রায় অসম্ভব ব্যাপার ছিল যিনি সত্তরের দশকে এই ম্যাচটার বিষয়ে কিছু অন্তত জানতেন না। ৩০ সেপ্টেম্বর, ১৯৭৫ । মোহনবাগান মাঠে আই এফ এ শিল্ডের ফাইনাল । মরসুমের শেষ ম্যাচ। ইস্টবেঙ্গলের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের বিরুদ্ধে পরিষ্কার ৫-০ ব্যবধানে জয়। চার দশক পেরিয়ে পাঁচ গোলের সেই বড় ম্যাচের কথা বাঙালির স্মৃতি থেকে কিন্তু মুছে যায়নি। মুছবেই বা কীভাবে ! বাঙালির মননে আজও যে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা অটুট। তেমনি অম্লান মোহনবাগান-ইস্টবেঙ্গল নামক দুটি ক্লাবের জনপ্রিয়তা।
তাই সবচেয়ে বেশি ব্যবধানে প্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাবকে হারিয়ে সেদিনের যুবক ইস্টবেঙ্গল সমর্থক আজ পৌঢ়ত্বে পৌঁছে কিছুটা স্মৃতিমেদুর। আবার আজকের প্রজন্ম সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটের দেওয়ালে তাঁর প্রিয় ক্লাব ইস্টবেঙ্গলের সেই ঐতিাহাসিক জয় নিয়ে ভুরি ভুরি পোস্ট করেই চলেছে অকৃপণভাবে। আর মোহন সমর্থকরা? তাঁরাও কি ভুলতে পেরেছেন এই হারের জ্বালা? বোধহয় না। সেদিন মাঠে উপস্থিত বা রেডিওতে কান পাতা সবুজ মেরুন শিবিরের অনেকেই সেদিনের সেই হার নিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। আবার অনেক পুরোনো মোহন সমর্থক নতুন প্রজন্মের মোহনবাগান সঙ্গে গলা মিলিয়ে হাল আমলের ৫-৩ এর জয়কে ৫-০ বদলা বলে চিহ্নিত করতে ভীষণভাবে মরিয়া।

east bengal5
১৯৭৫ -র ২৫ জুন দেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ফখরুদ্দিন আলি আহমেদ কেন্দ্রীয় সরকারের ক্যাবিনেটের প্রস্তাব মতো ইমার্জেন্সি বা জরুরি অবস্থা জারির কাগজপত্রে সই সাবুদ করেন। দেশজুড়ে চালু হয় ইমার্জেন্সি। আর পাঁচ গোলের বড় ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ৩০ সেপ্টেম্বর,১৯৭৫। অর্থাৎ জরুরি অবস্থার ৯৮ তম দিনে মোহনবাগান মাঠে এই ম্যাচটি খেলা হয়েছিল। সেদিক থেকে দেখলে এই ম্যাচের সময় কলকাতা শহরে রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে পৌঁছেছিল। রাজপথে পুলিশ- মিলিটারির দাপাদাপি, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, গ্রেপ্তারি সব মিলিয়ে শহর মোটেই স্বাভাবিক অবস্থায় ছিল না। কিন্তু শত অশান্তির মাঝেও ফুটবল মাঠে জনসমাগম কমেনি। বরং টিকিটের লাইন দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। বিশেষত, সত্তর দশকের শুরু থেকেই ইস্টবেঙ্গল মাঠে নতুন করে ঢল নামা শুরু হয়েছিল। কারণ আর কিছুই নয়। সত্তরের শুরুতেই বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় থেকে নতুন করে ওপার বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে নতুন করে এ বাংলায় শরণার্থীর ঢল নামে। দেশ বিভাগের সময়ের মতো পুরো শরণার্থীর চাপ শহর কলকাতাকে বহন না করতে হলেও বেশ ভালো সংখ্যক মানুষ নতুন করে আশ্রয়হীন অবস্থায় কলকাতা শহরে এসে নতুন করে তাঁদের জীবন জীবিকার জন্য সংগ্রাম শুরু করে। ইস্টবেঙ্গল ক্লাব তাঁদের কাছে আশ্রয়স্থল এবং ‘কালেক্টিভ আইডেন্টিটি’ প্রকাশের নিঃসন্দেহে বড় ক্ষেত্র ছিল।

মাথায় রাখা উচিৎ ৭০ সাল থেকে কিন্তু ইস্টবেঙ্গলের সাফল্যের গ্রাফ ক্রমশ উর্দ্ধমুখি হচ্ছিল। ঐ বছরই ১৯৭০ থেকে কলকাতা লিগ অর্থাৎ ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত টানা ছয়বার জিতে ইস্টবেঙ্গল মহমেডান স্পোর্টিংয়ের ব্রিটিশ আমলে গড়া টানা পাঁচবারের (১৯৩৪-৩৮) রেকর্ড ভেঙ্গে দিয়েছিল। আই এফ এ শিল্ড জিতেছিল পাঁচবার, যার মধ্যে শেষ চারবার (১৯৭৫-র ফাইনাল ম্যাচটি ধরে ) ছিল টানা সাফল্য (১৯৭০ এবং ১৯৭২-৭৫)। সঙ্গে ছিল দু’বার করে রোভার্স কাপ (১৯৭২-৭৩), ডি সি এম ট্রফি (১৯৭৩-৭৪),বরদৌলি ট্রফি (১৯৭২-৭৩) এবং ডুরান্ড কাপে(১৯৭০ এবং ১৯৭২ ) সাফল্য । খুব স্বাভাবিক কারণে ইস্টবেঙ্গলের এই নজীরবিহীন সাফল্য এই দলের খেলার সময় সমর্থকদের ভীড় বাড়তে থাকার নেপথ্যে বড় ভূমিকা পালন করেছিল তাতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সত্তরের উত্তাল কলকাতায় ‘ফুটবল মোব’ র সমাগম পুলিশকর্তাদের দুঃশ্চিন্তার বড় কারণ ছিল । বিপরীত প্রান্তে মোহনবাগানের সমর্থকরা ক্রমশ সাফল্যের জন্য অধৈর্য্য হয়ে উঠছিলেন। সত্তর দশকের প্রথম ছয় বছর মোহনবাগানের সবচেয়ে বড় সাফল্য বলতে ছিল বোম্বের (অধুনা মুম্বাই) রোভার্স কাপ টানা তিনবার জয় (১৯৭০-১৯৭২)। আর ছিল বরদৌলি ট্রফি (১৯৭৪ এবং ১৯৭৫)ও ডুরান্ড কাপে ( ১৯৭৪) কিছু সাফল্য। সবচেয়ে বড় কথা ১৯৭০ থেকে ১৯৭৫ শিল্ড ফাইনালের পর্যন্ত ইস্টবেঙ্গলের সঙ্গে ১৭ বার মুখোমুখি হয়ে মোহনবাগান জিততে পেরেছিল মাত্র ১ টি ম্যাচ। ড্র করতে সমর্থ হয়েছিল তিনটি ম্যাচ । বাকি ম্যাচগুলিতে বলাই বাহুল্য, পরাজয় ঘটেছিল।
তবে সে বছর লিগের খেলায় মোহনবাগান ০-১ গোলে ইস্টবেঙ্গলের কাছে পরাজিত হয়েছিল বটে কিন্তু খুব একটা খারাপ খেলেনি। এমনকি সে ম্যাচের পরে কলকাতার একটি নামজাদা কাগজ হেডিং করেছিল ‘খেললো মোহনবাগান, জিতলো ইস্টবেঙ্গল’। অনেক মোহন সমর্থকের আশা ছিল যে মরসুমের শেষ বড় ম্যাচে ঘরের মাঠে মোহনবাগানের তরুণ ব্রিগেড ইস্টবেঙ্গলের জয়ের অশ্বমেধ ঘোড়ার গতিরোধ করতে পারবে।

east bengal2

১৯৭৫ শিল্ড ফাইনাল ম্যাচটির টিকিটের টাকা আই এফ এর তরফে ঘোষণা করা হয়েছিল বিধান শিশু উদ্যানের উন্নতিকল্পে দান করা হবে। টিকিটের দাম সামান্য বাড়িয়ে করা হয় ৪ এবং ৬ টাকা। মোহনবাগান মাঠে দর্শক আসন ছিল ৩২ হাজার। ম্যাচের আগের দিন শহর জুড়ে টিকিটের জন্য হাহাকার চলেছিল।ম্যাচটি পরিচালনায় ছিলেন আসামের নিরপেক্ষ রেফারি বাবুল বার্মিজ (নওগাঁ)। আর লাইন্সম্যান ছিলেন সুরেন ফুকন (গৌহাটি) এবং উৎপল ভট্টাচার্য (ডিব্রুগড়)। খেলা শুরুর আগে দু দলের সঙ্গে সে ম্যাচের বিশেষ অতিথি ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী সুখময় সেনগুপ্ত এবং রাজ্যের ক্রীড়ামন্ত্রী প্রফুল্লকান্তি ঘোষের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। ম্যাচ শুরু হয় সোয়া দুটোয় । খেলার প্রথমার্ধে ইস্টবেঙ্গল ৩-০ গোলে এগিয়ে গিয়েছিল। পরের অর্ধে ইস্টবেঙ্গল আরো দুই গোল দেওয়ায় ব্যবধান দাঁড়ায় ৫-০। যা বড় ম্যাচে ১৯৩৬ এ কলকাতা লিগে ইস্টবেঙ্গলের মোহনবাগানের বিরুদ্ধে ৪-০ গোলে জয়ের রেকর্ডকে ভেঙ্গে দেয়। ম্যাচের পরে ইস্টবেঙ্গলের সমর্থকরা প্রবল উল্লাসে ফেটে পড়ে যা ক্রমশ শহরের বিভিন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। আর ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের মাথায় অর্থাৎ ২ রা অক্টোবর এই ম্যাচের ফলাফল সহ্য না করতে পেরে উমাকান্ত পালধি নামে পঁচিশ বছরের এক মোহনবাগান সমর্থক বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করেন। ঘটনাচক্রে সেটি ছিল জরুরি অবস্থার শততম দিন। সুইসাইড নোটে সাউথ সিটি রোডের বাসিন্দা উমাকান্ত এই আকাঙ্খা ব্যক্ত করে যে পরের জন্মে ভালো ফুটবলার হয়ে যেন সে মোহনবাগানের এই অপমান মুছিয়ে দিতে পারে। উমাকান্তের এই দূর্ভাগ্যজনক পরিণতি আসলে পাঁচ গোলের পরাজয় মোহনবাগান সমর্থকদের কতখানি মর্মাহত করেছিল তার প্রমান দেয়। তবে পাঁচ গোলে হেরে মোহনবাগান কিন্তু তলিয়ে যায়নি। পরের মরসুম থেকে প্রবলভাবে লড়াইয়ে ফিরে এসেছিল। পরের বড় ম্যাচ ছিল ১৯৭৬ কলকাতা লিগের খেলা । সেই বড় ম্যাচও ছিল ঐতিহাসিক। কারণ সে ম্যাচে মোহনবাগান আকবরের করা ১৭ সেকেণ্ডের গোলে ইস্টবেঙ্গলকে হারিয়ে দিয়েছিল। আগের ম্যাচের ম্যাচের যন্ত্রণা যেমন মোহন জনতাকে আজও তাড়া করে, তেমনি পরের ম্যাচের জয়টাও থেকে গেছে, সেই ঘায়ের মলম হিসেবে।

(লেখক একজন অধ্যাপক ও ফুটবল গবেষক। বেঙ্গল টাইমস পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত। )

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

5 + 15 =

You might also like...

radio3

না বোঝা সেই মহালয়া

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk