Loading...
You are here:  Home  >  জেলার বার্তা  >  দক্ষিন বঙ্গ  >  Current Article

রবি চ্যাটার্জিঃ যেন এই সময়ের চাঁদ সদাগর

By   /  May 29, 2015  /  No Comments

স্বরূপ গোস্বামী

 

এত পুজো পেয়েও মা মনসার তৃপ্তি নেই। তাঁকে চাঁদ সদাগরের পুজো পেতেই হবে।

কিন্তু শিবভক্ত চাঁদ সদাগর কিছুতেই মনসার পুজো করবেন না। কী করে বাগে আনা যায় চম্পকনগরের এই বণিক চাঁদ সদাগরকে ? একে একে ছয় পুত্রকে সর্পাঘাতে মেরে ফেলা হল।

বাণিজ্য তরী নিয়ে ফের বেরোলেন বণিক চাঁদ সদাগর। ফেরার পথে প্রবল ঝড়। সৌজন্যে, সেই মনসা। ডুবে গেল সপ্তডিঙ্গা। ডুবে গেলেন সঙ্গীরা। ভাসতে ভাসতে চাঁদ দিয়ে উঠলেন চন্দ্রকেতুর কাছে। চন্দ্রকেতুও বোঝালেন, মনসার সঙ্গে বিবাদ করে লাভ নেই। ওর পুজো করেই ফেলো।

কিন্তু তাতেও রাজি নন। সব হারিয়ে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করলেন। ছেলে হল, নাম রাখলেন লখিন্দর। বিয়ে হল বেহুলার সঙ্গে। লোহার বাসরঘর করে, নিজে পাহারা দিয়েও প্রাণরক্ষা করতে পারলেন না লখিন্দরের। ‘ভেসে যায় ভেলা’। সঙ্গে ভেসে চলেন বেহুলা। মনসার একটাই শর্ত, তোমার শ্বশুর যদি আমার পুজো করে, তাহলে তোমার স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে দেব।

ma manasa

বেহুলা বোঝালেন, তিনি শ্বশুরকে রাজি করাবেন। পুত্রর প্রাণ ফিরিয়ে আনার তাগিদে, অবশেষে চাঁদ সদাগর রাজি হলেন মনসার পুজো করতে। পুজো করলেন, তবে প্রবল অবজ্ঞায়, বাঁ হাতে।

রবি চ্যাটার্জির তৃণমূলে যোগ দেওয়ার ঘটনায় মঙ্গলকাব্যের এই চরিত্রের কথাই মনে পড়ে যাচ্ছে। রবি বাবুকে চিনি প্রায় দুই দশক ধরে। বাংলার বুকে যে কয়েকজন রাজনীতিক নিজেদের মর্যাদা বজায় রেখে রাজনীতি করেন, রবি চ্যাটার্জি অবশ্যই তাঁদের একজন। এখনও বিশ্বাস করি, যাঁরা সামান্য ক্ষমতার লোভে দল বদল করেন, সেই তালিকায় রবি চ্যাটার্জি পড়েন না।

কখনও কারও নামে অশ্লীল কথা বলেননি। টিভি চ্যানেলের স্টুডিওতে কোনও দিন গেছেন বলে মনে হয় না। কখনও কাউকে অসম্মান করেছেন, এমনটা শোনা যায়নি। ২৫ বছর বিধায়ক আছেন। কোনওদিন কোনও বিতর্কের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছে, এমনটা মনে করতে পারছেন ? এলাকাতে জন সংযোগ কতটা, তা টানা জয় দেখেই বোঝা যায়। হাওয়ায় জেতা বা মসৃণ সংগঠনের দৌলতে জেতা বিধায়ক তিনি নন। সব প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করে কুড়ি বছর কাটোয়া পুরসভা ধরে রেখেছিলেন। এই ধরে রাখতে গিয়ে ‘বোমা বন্দুক’ এর রাজনীতি করতে হয়েছে, এমনটা বিরোধীরাও কখনও বলবেন না।

ma manasa2

তাঁকে দলে পাওয়ার কী মরিয়া চেষ্টাই না হয়েছে! এ তো রূপকথার দেশ নয়। তাই, চাঁদ সদাগরের পুজো পেতে মনসা যা যা করেছিলেন, ততটা হয়ত তাঁর ক্ষেত্রে ঘটেনি। তবে রবি বাবুর অভিজ্ঞতাও ভাল নয়। সেই কলেজ ভোট থেকে শুরু। অন্য জেলা থেকে এসে প্রকাশ্যে তাঁর এলাকায় হুমকি দিয়ে এলেন অনুব্রত। বাড়ি ঘেরাও করা থেকে হেনস্থা করা, হুমকির আওতা থেকে বাদ গেল না কোনও কিছুই। তবু গো হারান হারতে হল তৃণমূলকে ।

পুরভোটের আগেও ‘উন্নয়নের কর্মযজ্ঞে’ সামিল করার কতই না চেষ্টা। না পেরে, ভোটের দিন যা হল, সেই থমথমে ছবিটা দেখেছে সারা রাজ্যের মানুষ। কাছের লোকেদের কাউকে লোভ দেখিয়ে দলে টেনে নেওয়া, কাউকে মিথ্যা মামলায় জেলে ভরা, কাউকে ভয় দেখিয়ে টানা, চেষ্টার কসুর ছিল না।

এতকিছুর পরেও বোর্ড দখল হল না শাসকের। সেই দশ-দশ। এবার রবি বাবুর শিবির থেকে তিনজনকে ভাঙিয়ে নেওয়া হল। নিশ্চয় বৈষ্ণব পদাবলী পড়িয়ে বা নেত্রীর কবিতা শুনিয়ে নয়। আক্রান্ত কর্মীরা সেই রবি বাবুর কাছেই ছুটে আসছেন। বয়স বেড়েছে অনেকটাই। শরীরও আগের মতো সঙ্গ দিচ্ছে না। প্রশাসন নির্লজ্জভাবে শাসকের পাশে। কী জানি, তিনি ফোন করলে ধরা চলবে না, থানার ওসির উপর হয়ত এমন ফতোয়াও দেওয়া আছে। যাঁরা শিলিগুড়ি থেকে আসা কুড়ি বছরের মন্ত্রী অশোক ভট্টাচার্যকে দেখা না করে ফিরিয়ে দিতে পারেন, তাঁরা রবি চ্যাটার্জিকেও অসম্মান করতেই পারেন। ‘মা মনসা’কে তুষ্ট করতে কত লোক কত নিচে নামতে পার, তা তো অহরহ দেখা যাচ্ছে।

ভোটের পরেই বলেছিলেন, ‘শাসক দল কিছুতেই বোর্ড গঠন করতে দেবে না। যদি বোর্ড গঠন হয়ও, তবু ওরা কোনও কাজ করতে দেবে না। কাটোয়ার সমস্ত উন্নয়ন স্তব্ধ হয়ে যাবে।’ জল্পনা ছড়াল, তিনি তৃণমূলে যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার কংগ্রেস পরিষদীয় দলের সভায় মহম্মদ সোহরাব বললেন, ‘আমি সরে দাঁড়াচ্ছি। আপনি পরিষদীয় নেতা হোন। বিধানসভায় দলকে নেতৃত্ব দিন। আমরা সবাই আপনার নেতৃত্বে লড়ব।’ রবি বাবু বলেছিলেন, ‘আপনাদের উপর আমার কোনও রাগ বা অভিমান নেই। কাটোয়ার মানুষকে বাঁচাতে আমার এছাড়া আর উপায় নেই।’

অবশেষে তৃণমূল ভবনে সাংবাদিক সম্মেলন। তাঁর হাতে পতাকা তুলে দিলেন দলের মহাসচিব পার্থ চট্টোপাধ্যায়। কেউ দলে যোগ দিলে, সবাইকে যা পাখিপড়া করে শেখানো হয়, রবি বাবুকেও নিশ্চয় তাই শেখানো হয়েছিল।

rabi chatterjee

সাংবাদিক সম্মেলনে কয়েকটি অদ্ভুত জিনিস দেখলাম। প্রশ্ন করা হচ্ছে রবিবাবুকে। উত্তর দিয়ে চলেছেন পার্থ চ্যাটার্জি। কংগ্রেস কর্মীদের উপর মামলা নিয়ে রবিবাবুকে প্রশ্ন, পার্থবাবুর উত্তর, ‘আইন আইনের পথে চলবে।’ বোধ হয়, এই একটু স্তোকবাক্যই মুখস্থ করে এসেছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। প্রশ্ন করলেই প্রশ্নকর্তাকে ধমক, আর একটাই উত্তর, ‘আইন আইনের পথেই চলবে।’

ছবি অনেক কিছুই বলে দিয়ে যায়। এক কোনে বসা রবিবাবুর ফ্যাকাসে মুখটাও অনেক কিছুই বলে দিচ্ছিল। বোঝা যাচ্ছিল, তিনি কতটা অসহায়। বোঝা যাচ্ছিল, পুলকিত হয়ে তিনি তৃণমূল ভবনে আসেননি। ‘উন্নয়নের স্রোতে’ গা ভাসাতেও আসেননি। প্রিয় পাঠক, রবি চ্যাটার্জিকে ‘ধান্দাবাজ’, ‘পাল্টিবাজ’, ‘সুবিধাবাদী,’ এসব বলার আগে প্লিজ দু’বার ভাবুন। ভাবুন, একটা মানুষ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একা কী কঠিন লড়াইটা  লড়ে গেছেন। চাঁদ সদাগরের জন্য যদি শ্রদ্ধা থাকে, তবে কিছুটা শ্রদ্ধা এই লড়াকু মানুষটার জন্যও থাকুক। অন্তত এটুকু তাঁর প্রাপ্য।

সাংবাদিক সম্মেলনে দু- চারটি কথা বললেন। একটি কথা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। ‘কাটোয়ার মানুষের শান্তির জন্যই মমতা ব্যানার্জির দলে যোগ দিলাম’।

যা বলার, এই একটি বাক্যেই বলে দিলেন। কাটোয়ায় অশান্তির কারণ কে বা কারা, সেটাও বোধ হয় খোদ তৃণমূল ভবনে বসেই বুঝিয়ে দিলেন। বাঁ হাতে পুজো দেওয়ার সেই কাহিনীটা মনে পড়ে গেল।

অনেক চেষ্টার পর বাঁ হাতের পুজো তো পেয়েছেন। ‘মা মনসা’ নিশ্চয় এবার খুশি।।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

19 − 17 =

You might also like...

radio3

না বোঝা সেই মহালয়া

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk