Loading...
You are here:  Home  >  ওপেন ফোরাম  >  Current Article

লছমন ঝুলা

By   /  April 15, 2016  /  No Comments

সব্যসাচী কুণ্ডু

একদিকে পাল্লা দিয়ে যেমন গরম বেড়ে চলেছে অন্যদিকে ভোটের আবহাওয়া বেশ উত্তপ্ত।প্রতিদিন খবরের কাগজ পড়লেই সেটা বেশ টের পাওয়া যাচ্ছে।আর কদিন পরেই দ্বিতীয় দফার ভোট।শাসক বিরোধী সবাই নিজের নিজের এলাকায় প্রচারে ব্যস্ত।দ্বিতীয় দফার ভোট যেখানে যেখানে হবে তারমধ্যে এই উত্তরপাড়াও আছে।এবার উত্তেজনাপূর্ণ কেন্দ্রগুলির মধ্যে উত্তরপাড়া প্রথম সারিতে আছে।ভোটারদের আশ্বস্ত করতে কেন্দ্রীয় বাহিনী আছে!তাতে খুব একটা সুরাহা হবে বলে মনে হয় না।বাহিনী বেশি থাক বা কম থাক তাতে এখানের দোর্দণ্ড প্রতাপ নেতা বিশ্বনাথ বনিকের ওরফে বিশুদার কিছু যায় আসে না।উনি ওনার হিসাবে ভোট করাবেন যেমন বিগত কয়েক বছর ধরে হয়ে আসছে।ওনার হুঙ্কারে বাঘে গরুতে এক ঘাটে জল খায়। বিরোধীরা তো ওনার ভয়ে গুটিয়েই থাকে।এই তো সেদিন পেপারে ওনার সাক্ষাৎকার বেরিয়ে ছিল। তাতে উনি পরিস্কার বলে দিয়েছেন যে, “এবারও আমরা বিপুল ভোটে জয়ী হব। ভোটের দিন বিরোধীদের দেখাই যাবে না।সবাই ভ্যনিস হয়ে যাবে। আমি তো আর ছোট খাটো জাদুকর নই।”ওনার গেমপ্ল্যন যে কী থাকবে সেটা মোটামুটি এখানকার ভোটাররা সবাই জানে।তবুও আড়ালে আবডালে কেউ কেউ আক্ষেপ করে বলেন, “এ কোন গণতন্ত্রে আমরা বাস করছি, নিজের ভোট নিজে দিতে পারবো না।”

lachhman jhula2
নকুল বাবু এই এলাকার বাসিন্দা।এর আগেও অনেক ভোট দিয়েছেন।কিন্তু বিগত কয়েক বছর যেভাবে ভোট হচ্ছে তাতে উনি যারপরনায় অসন্তুষ্ট।এবার ভোটটা নিজের পছন্দের প্রার্থী কে দিতে পারবেন কি না সেটায় বাড়ির দাওয়ায় বসে রামসিং দারোয়ানের সাথে আলোচনা করছিলেন। রাতের খাবার পর রামসিং এর সাথে আড্ডা দেওয়াটা তাঁর অনেকদিনের অভ্যাস।রামসিং খালি বলে এই সব নেতাদের যদি আমাদের গ্রামে পেতাম না তাহলে একবার লছমন ঝুলা দেখিয়ে দিতাম।তারপর খানিকক্ষণ লছমন ঝুলা জিনিসটা কি সেটা নকুলবাবুকে বুঝিয়ে দিয়ে সে পাহারা দিতে চলে গেলো আর নকুলবাবু দরজার খিল তুলে শুয়ে পড়লেন।
ঘড়িতে তখন প্রায় রাত্রি এগারোটা বাজে।রাস্তাঘাট শুনশান।খালি দুর্গামন্দিরের পেছনে শাসক দলের পার্টিঅফিসটা খোলা। সেখানে বিশুদা কিছু বিশ্বস্ত সাগরেদদের নিয়ে হিসাব নিকাশে ব্যস্ত। যদিও ওনার বিশ্বাস যে উনি জিতবেন। তবুও যদি কিছু উল্টো পাল্টা হয়ে যায়। এমন সময় এক ছোকরা অফিস ঘরে ঢুকে বলল, “ দাদা এক বুড়ো আপনার সাথে দেখা করতে এসছেন।” বিশুদা বিরক্ত হয়ে বললেন, “দেখছিস না আমি ব্যস্ত, বলে দে আজ দেখা হবে না, ভোটের পর আসতে।”
ছোকরাটা কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল, তখন সদর দরজা দিয়ে এক বুড়ো উকি মেরে বলল , “ভেতরে একটু আসতে পারি কত্তা? অনেক দূর থেকে এসছি, একটু দরকার ছিল।” বিশুদা চোখ গোল গোল করে বললেন, “তোমার সাহস তো কম না, না বলে কয়ে একেবারে বাঘের গুহায় ঢুকে পড়েছ।” বুড়ো দু পা এগিয়ে এসে বলল , “ আজ্ঞে কত্তা আপনার কথা খুব শুনেছি তাই একবার চাক্ষুষ দর্শনের শখ হল, তাই এলাম আর কি।”
বিশুদা চোখ গোল গোল করে বুড়োর আপাদ মস্তক নিরীক্ষণ করতে লাগলেন , বুড়োর পরনে সাদা খাটো ধুতি আর পাঞ্জাবী।পায়ের চটি দুটো ধুলোয় লাল হয়ে গেছে।মাথার চুল সব সাদা। তোবড়ানো গাল। বিশুদা এবার একটু নরম গলায় বললেন , “দর্শন হয়ে গেছে। এবার এসো। এখন আমি খুব ব্যস্ত।” বুড়ো এবার এক গাল হেসে বলল , “আজ্ঞে কত্তা আর তো আসা হবে নি। একটু আলাপ পরিচয় করে চলে যাব। দিব্যি করে বলছি আপনার বেশি সময় নষ্ট করবো না।” বেশ বিরক্ত হয়ে বিশুদা বলল , “বল কী বলবে?” বুড়ো একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “কত্তা একটু খাবার জল হবে, গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে।” বিশুদা ইশারা করতেই এক ছোকরা এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলো। বুড়ো তৃপ্তির সাথে জলটা খেয়ে একটা ফাকা চেয়ার দেখে বসল। ঘরে বুড়োকে নিয়ে জনা বারো লোক ছিল। বাকিরা সব নিজের নিজের কাজ বুঝে নিয়ে চলে গেছে। এবার বুড়ো বলল , “খবরের কাগজে আপনার নামে লেখা খুব পড়ি। আপনার কথার একটা ওজন আছে কত্তা। তারপর ঐ কথাটা আপনি একজন জাদুকর সবাইকে ভ্যনিস করে দেবেন। এটা আমার খুব ভালো লেগেছে।” বুড়োর মুখে নিজের নাম শুনে যারপরনায় আহ্লাদিত হয়ে চেয়ারে হেলান দিয়ে গোঁফে তা দিতে দিতে বিশুদা বলল , “আজকাল ভোটে জেতা কি চাট্টিখানি ব্যপার। অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হয় জানো? তা তোমার আসার মতলবটা কী সেটা তো বল্লে না।” বুড়ো এবার মুখটা একটু বাড়িয়ে গলাটা খাদে নামিয়ে বলল , “একটু বিশেষ দরকারে এখানে আসা , না এলে আপনার খুব অসুবিধা হয়ে যেত। যদি দয়া করে একটু দরজাটা বন্ধ করিয়ে দেন , কেউ শুনে ফেললে খুব ঝামেলা হবে।” একটু বিরক্ত হয়ে বিশুদা একটা ছেলেকে ইশারা করতেই সে দরজাটা ভিজিয়ে এলো। বুড়ো চেয়ারে একটু সোজা হয়ে বলল, “কত্তা আপনি লছমন ঝুলা জানেন?” বিশুদা বললেন, “সে তো উত্তর ভারতে। তার সাথে ভোটের কী সম্পর্ক।” বুড়ো একগাল হেসে বললেন , “আছে আছে।” এবার বুড়ো পাঞ্জাবির বাম পকেট থেকে একটা নস্যির কৌটো বের করে এক টিপ নস্যি নিল। আর ডান পকেট থেকে একটা কাগজের প্যাকেট বার করে তার থেকে কিছুটা সাদা পাউডার হাতে নিয়ে সবাই কে জিঞ্জেস করলো , “এটা কী জানেন?” সবাই জিনিসটা দেখার জন্য মাথা বাড়াতেই বুড়ো জোরে এক ফুঁক মারল, দেখতে দেখতে সারা ঘর ভরে গেলো আর সবাই হাঁচতে সুরু করলো। সে বেদম হাঁচি থামতেই চায় না। হাঁচতে হাঁচতে সবাই মূর্ছা গেল, আর বুড়ো মুখে রুমাল দিয়ে বসে বসে হাসতে লাগল। কিছুক্ষণ পর পার্টি অফিসের সামনে একটা বড় গাড়ি এসে থামল। দশ বারোজন ষণ্ডা মার্কা লোক এসে সব কটাকে গাড়িতে তুলে ধুলো উড়িয়ে গায়েব হয়ে গেলো। কাক পক্ষীও কিছু টের পেল না।

anubrata8

বিশুদা যখন চোখ খুললেন প্রথমে ঠাহর করতে পারলেন না কোথায় আছেন।মাথায় কে যেন জোরে জোরে হাতুড়ি মারছে , নাকের ভেতরটা এখনো সুড় সুড় করছে। কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে ভাবার পর আস্তে আস্তে সব মনে পড়লো। চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখলেন যে একটা সুসজ্জিত ঘরের ঠিক মাঝখানে উনি বসে আছেন, একটা শক্ত দড়ি দিয়ে শরীরটা চেয়ারের সাথে বাঁধা । আর সেই বুড়োটা সামনে একটা চেয়ারে বসে আছে। আজকে পরনে একটা ঝলমলে আলখাল্লা আর মাথায় জাদুকরের টুপি। বিশুদা নিজেকে ছাড়ানোর বৃথা চেষ্টা করে নিজের স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গীতে হুঙ্কার দিয়ে বললেন, “বুড়ো তুই কাজটা ঠিক করলি না, তুই জানিস না আমি কে? একবার ছাড়া পায় তারপর তোকে দেখে নেবো”। বুড়ো একচোট হেসে নিয়ে বলল, “কত্তা আপনি আপনার এলাকা থেকে বহুদুরে আছেন।এখানে আপনি কিচ্ছুটি করতে পারবেন না। এখানে আমার শাসন চলে।” একটু দমে গিয়ে বিশুদা বলল , “তোমার মতলবটা কি?এভাবে আমাকে ধরে রাখার মানেটা কি?” বুড়ো হাতের লাঠিটা নাচাতে নাচাতে বলল , “রোস রোস কত্তা সব বলবো ,আগে কিছু নাস্তা পানি হয়ে যাক।” “না না আমার কিছু লাগবে না, তোমার মতলবটা আগে বল?” বুড়ো বলল , “ঐ যে কালকে বললাম যে তোমাদের লছমন ঝুলা দেখাবো।” বুড়ো হাততালি দিতেই চারজন পালোয়ান ঘরে এলো। বুড়ো ওদের বললেন, “এনাকেও নিয়ে যাও।” বিশুদাকে ওরা দড়ি খুলে আর একটা ঘরে নিয়ে গেল। সেখানে ঢুকেই বিশুদার চোখ ছানাবড়া। ঘরের সিলিং থেকে মোটা মোটা দড়ি ঝুলছে, দুটো দড়ির মাঝখানে একটা করে মোটা বাঁশের লাঠি বাঁধা। তাতে বিশুদার সাগরেদদের হাত আর পা বেঁধে উল্টো করে ঝোলানো।আর সবার পরনে জাঙ্গিয়া। দেখে বিশুদার ভয়ে গলা শুকিয়ে কাঠ। কোনওমতে গলার জোর এনে বললেন, “একি? এসব কী হচ্ছে?” বুড়ো এবার অট্টহাসিতে ফেতে পড়ে বলল, “ ওরে এরই নাম লছমন ঝুলা , তোদের মতো শয়তানদের শায়েস্তা এভাবেই করা হয়।” তারপর বুড়ো তাঁর লোকদের আদেশ দিতেই বিশুদাকেও ওরা টাঙ্গিয়ে দিলো ।তারপর তেল মাখানো মোটা লাঠি দিয়ে পায়ের নিচে আর পশ্চাৎ দেশে চলল বেদম মার। আর বুড়ো হাসতে হাসতে বলতে লাগলো, “দেখ কে বড় জাদুকর”।

lachhman jhula3
রোদের হাত থেকে বাঁচতে নকুলবাবু সকাল সকাল বুথে ছুটলেন ভোট দিতে।বুথের কাছে গিয়ে তো উনি অবাক।এতো শান্তিপূর্ণ ভোট উনি শেষ কবে দেখেছেন ঠিক মনে করতে পারলেন না ।খুব লম্বা লাইন। সবাই শান্তিপূর্ণভাবে ভোট দিচ্ছেন । কোনও ঝামেলা ঝঞ্ঝাট নেই।যাদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে, তাঁরা হাসতে হাসতে বাড়ি যাচ্ছেন। একটু এদিক ওদিক তাকাতেই চোখে পড়ল একটা স্টল। সেখানে স্বয়ং বিশুদা দাড়িয়ে । ওনার সাথে চোখাচোখি হতেই ডাকলেন , “এই যে নকুলদা এদিকে আসুন”। কাছে যেতেই এক গ্লাস সরবত ধরিয়ে দিয়ে বললেন, “এটা খেয়ে নিন যা রোদ আর আরামসে গিয়ে ভোট দিন। যাকে খুশি ভোট দিন, নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিন। নকুলবাবু একবার হাতের গ্লাসের দিকে আর একবার বিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবতে লাগলেন, “তাহলে? কাল রাতে যেটা স্বপ্ন ভাবছিলাম সেটা স্বপ্ন নয়?”
(সব চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে এর মিল খোঁজা বৃথা।)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

2 × three =

You might also like...

shimultala2

শীতের ছোট্ট ছুটিতে শিমূলতলা

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk