Loading...
You are here:  Home  >  ওপেন ফোরাম  >  Current Article

প্রকৃতি আছে, পরিকাঠামো নেই জয়ন্তীতে

By   /  March 29, 2017  /  No Comments

আরণ্যক ঘোষ

তখন দরজায় সবে কড়া নাড়ছে সাতের দশক। চার বন্ধু মিলে বেড়াতে গিয়েছিল পালামৌ জঙ্গলে। সেখানে একটি স্টেটসম্যান কাগজে আগুন ধরিয়ে একজন বলেছিল, সভ্যতার সঙ্গে সব সম্পর্ক শেষ। নিশ্চয় অরণ্যের দিনরাত্রির কথা মনে পড়ছে !

ঠিক তিরিশ বছর পর। সেই চরিত্রগুলো এখন কে কেমন আছে, তা নিয়ে তৈরি হয়েছিল আরেকটি ছবি- আবার অরণ্যে। এবারও লেখক সেই সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়। তবে পরিচালক গৌতম ঘোষ। এবার আর পালামৌ নয়, উত্তরবঙ্গের জঙ্গল। জয়ন্তী নদীর সেই ভাঙা ব্রিজের কাছে দাঁড়িয়ে শাশ্বত-র সেই সংলাপটা মনে পড়ছে ? ‘সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছি।’ আসলে, ওই ভাঙা ব্রিজ থেকে সেদিন মোবাইলের নেটওয়ার্ক পেয়েছিলেন শুভেন্দু-পুত্র শাশ্বত।

jayanti2

সেটা ২০০৩। মোবাইল নামক জিনিসটা কলকাতার গন্ডি ছেড়ে তখনও সেভাবে বাইরে পা রাখেনি। তখনই নাকি জয়ন্তীর ভাঙা ব্রিজ থেকে নেটওয়ার্ক পেয়েছিলেন। কিন্তু এই ২০১৭ তে, যখন প্রত্যন্ত গ্রামেও পৌঁছে গেছে মোবাইল পরিষেবা, তখন জয়ন্তী কিন্তু প্রায় পরিষেবার বাইরেই। কখনও নদীর ধারে বা কখনও সেই ভাঙা সেতুর কাছে গিয়ে হয়ত নেটওয়ার্ক খুঁজতে হবে। নতুন টাওয়ার বসানোর পরেও সব নেটওয়ার্কে ফোন পাওয়া যায় না। আর নেটওয়ার্ক পেলে শাশ্বত-র মতোই বলতে হবে, সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করেছি।

আসলে, যে কথা বলতে দুটি সিনেমার উপমা টানা, তা হল, জয়ন্তীতে এখনও পর্যটনের পরিকাঠামোই গড়ে ওঠেনি। ডুয়ার্সের রানি বলা হয় এই জয়ন্তীকে। সাহিত্যে, সিনেমায় বারবার উঠে এসেছে এই জয়ন্তী। ডুয়ার্সে বেড়ানোর কথা উঠলেই অনেকের মন ছুটে যায় জয়ন্তীতে। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রীও বারবার জয়ন্তীকে ঘিরে টুরিজম সার্কিট গড়ে তোলার কথা বলেছেন। কিন্তু কথাই সার। পর্যটন কেন্দ্র হয়ে উঠতে গেলে যা যা পরিকাঠামো লাগে, তার অধিকাংশই নেই এই জয়ন্তীতে।

কী কী নেই, সেই তালিকায় না হয় আগে একবার চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক।

১) সারা বাংলা জয়ন্তীর নাম জানে। অথচ, এখানে কোনও এটিএম কাউন্টার নেই। পর্যটকদের অনেকেই সঙ্গে হয়ত তেমন টাকাপয়সা আনেননি। ভেবেছেন, জয়ন্তীতে গিয়ে এটিএম থেকে তুলে নেবেন। কিন্তু এটিএম না থাকায় কত লোককে যে কত অস্বস্তির মধ্যে পড়তে হয়! অনেকের তো হোটেলের বিল মেটানোর টাকাটুকুও সঙ্গে থাকে না। কার কাছে চাইবেন, তাও বুঝতে পারেন না। নোটবাতিলের পর কত লোককে যে সমস্যায় পড়তে হয়েছে!‌ এমনকী এটিএম নেই শুনে অনেকে আসব ভেবেও আসেননি।

jayanti3

২) বেশ এটিএম না হয় নেই। ব্যাঙ্ক থাকলেও অন্তত চেক থেকে টাকা তোলা যেত। অন্তত হোটেলের বিল বা গাড়ির বিল মেটানো যেত। হায়! ব্যাঙ্কও নেই।

৩) সবার গাড়িতে আসার সামর্থ্য থাকে না। আলিপুরদুয়ার থেকে তেমন দূরও নয়। মোটামুটি তিরিশ কিমি–‌র মতো। কিন্তু একটি বাস। সকালে যায়, বিকেলে ফিরে আসে। আর যাতায়াতেই কোনও উপায় নেই। সকালের বাস মিস করলে তাঁর গাড়ি ভাড়া করা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই।

৪) জঙ্গলে এসে হঠাৎ যদি রোগ অসুখ হল! বা কেউ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। না, কোনও নার্সিংহোম বা স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই। এমনকি ডাক্তারও নেই। নিয়ে যেতে হবে আলিপুরদুয়ারে। ততক্ষণে বিপদ ঘটে যেতেই পারে।

৫) যাঁরা মিনারেল ওয়াটার গাড়িতে লোড করে আনলেন, তাঁদের কথা আলাদা। দু একটা দোকানে সেই বোতল পেতেও পারেন। কিন্তু এছাড়া পরিশ্রুত পানীয় জলের কোনও ব্যবস্থাই নেই।

৬) বেশিরভাগ এলাকাই ফরেস্টের জায়গা। ফলে হোটেল করার সরকারি অনুমতি নেই। তবু লিজ নিয়ে যাঁরা করেছেন, সেখানেও নির্দিষ্ট কোনও রেট কার্ড নেই। যার যা খুশি, সে তাই ভাড়া নেয়।

৭) গাড়ির ক্ষেত্রেও তাই। নির্দিষ্ট কোনও রেট নেই। যার যা খুশি, তাই নেয়। সেটা না দিয়ে উপায়ও থাকে না। গাইডের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। একেক জন একেক রকম রেট হাঁকবেন। আবার গাইড না নিয়ে আপনি জঙ্গলে ঢুকতেও পারবেন না।

৮) জঙ্গল সাফারি। যে কোনও পর্যটকই এই সাফারিতে যেতে চান। জলদাপাড়ার বা অন্যান্য জঙ্গলের মতো এখানে হাতি সাফারির ব্যবস্থা নেই। বন দপ্তর বারবার বলছে, গাড়িতে কমার্শিয়াল নম্বর নিতে। কিন্তু চালকদের আগ্রহ নেই। তাই গভীর জঙ্গলে এইসব গাড়ি ঢুকতেও পারে না। অথচ, জলদাপাড়া বা চিলাপাতায় এই ব্যবস্থা আছে।

jayanti5

৯) সরকারি পরিষেবা তেমন নেই। যে বাংলো আছে, তার বুকিংয়ে নানা ঝামেলা। দরও আকাশছোঁয়া। বন দপ্তরের উদ্যোগে যে কটেজ তৈরি হয়েছে, সেগুলিও ঠিক উপযুক্ত মানের নয়। অনেকেরই হয়ত পছন্দ হবে না।

১০)‌ জয়ন্তী এলে অনেকেই ট্রেকিংয়ে মহাকাল মন্দিরে যান। কিন্তু না জানলে আপনি অন্ধের মতোই হেঁটে যাবেন। রাস্তার মাঝে কয়েকটি দিক নির্দেশিকা থাকলে সুবিধা হয়।
এ তো গেল নেই-এর কাহিনী। বছর দুই আগের একটি ঘটনার কথা বলা যাক। মুখ্যমন্ত্রীর কথায় মাঝে মাঝেই উঠে আসত জয়ন্তীর কথা। প্রায়ই তিনি বলতেন জয়ন্তীকে আরও সুন্দর করতে চান। তাই উত্তরবঙ্গ সফরের সময় ঠিক করেছিলেন তিন রাত্রি ডুয়ার্সে থাকবেন। ঠিক ছিল, এক রাত মাদারিহাটে, একরাত জলদাপাড়ায়, আর একরাত জয়ন্তীতে থাকবেন। প্রথম দুই জায়গায় রাতে থাকলেন। তৃতীয় দিন বিশাল কনভয় নিয়ে এলেন জয়ন্তীতে। তাঁর থাকার ব্যবস্থা হয়েছিল পি এইচ ই বাংলোতে। যতটা সাজানো সম্ভব, সাজানো হয়েছিল। কিন্তু তা সত্ত্বেও একেবারেই মনে ধরেনি মুখ্যমন্ত্রীর। বনদপ্তরের কর্তা ও স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের রামবকুনি হজম করতে হয়েছিল। এমন জায়গায় আমাকে কেন আনা হয়েছে ? এই বলে নাকি চিৎকার শুরু করে দেন মুখ্যমন্ত্রী। অর্থাৎ, মোহভঙ্গ হতে সময় লাগেনি। না, আর রাত কাটানোর কথা ভাবেননি মুখ্যমন্ত্রী। আবার ফিরে গেলেন জলদাপাড়ায়।

তবু তো মুখ্যমন্ত্রীকে এটিএম খুঁজতে হয়নি। ডাক্তারখানায় যাওয়ার দরকার পড়েনি। এমনকি পাবলিক বাসেও আসতে হয়নি। সঙ্গে এত বড় বাহিনী। তাই নেটওয়ার্ক খোঁজারও দরকার নেই। জলের ব্যবস্থাও নিশ্চয় ছিল। তবু তিনি চলে গেলেন। তাহলে সাধারণ পর্যটকদের অবস্থা কী হতে পারে, একটু ভেবে নিন।

আসলে, সভ্যতার সঙ্গে এখনও বোধ হয় জয়ন্তীর সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি।
‌‌‌

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × five =

You might also like...

amstrong3

চাঁদে কি সত্যিই মানুষ গিয়েছিলেন ?

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk