Loading...
You are here:  Home  >  জেলার বার্তা  >  দক্ষিন বঙ্গ  >  Current Article

তল্লাশির নামে এমন অসভ্যতা?‌

By   /  March 18, 2017  /  No Comments

দুর্নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে জেলে যেতে হল। কিন্তু তারপর চারদিন ধরে কী কী মর্মান্তিক অভিজ্ঞতা হল?‌ শুনুন এস এফ আই রাজ্য সভানেত্রী মধুজা সেনরায়ের বয়ানে।
প্রিয় পাঠক,
প্রথমেই আপনাদের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ১৫ তারিখই যে অভিজ্ঞতা আপনাদের সামনে নিয়ে আসা উচিত ছিল, কিছুটা মানসিক আর বেশ কিছুটা শারীরিক ক্লান্তির কারণে, তা পেরে উঠিনি। কিছুটা দেরিতেই আপনাদের কাছে জেলের ভেতরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
দিনটা ৯ই মার্চ টেট পরীক্ষা এবং প্রাইমারি স্কুলের শিক্ষক নিয়োগে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগে মিছিল আহ্বান করেছিলাম আমরা। আমরা — মানে এস এফ আই, ডি ওয়াই এফ আই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটি। অনেক টালবাহানার পর পুলিশের অনুমতি মেলে মিছিল করার জন্য। পুলিশের দেওয়া টাইম মেনে বেলা তিনটে নাগাদ আমরা মিছিল শুরু করি। কলেজ স্ট্রিট থেকে পথ চলা শুরু করে ওয়েলিংটন স্কোয়ার, এস এন ব্যানার্জি রোড হয়ে মিছিল ধর্মতলা পৌঁছায়। স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে ধর্মতলা চত্বর। (যা কিনা যে কোনো সংগঠনের ডাকা মিছিলেই হয়ে থাকে) শিক্ষামন্ত্রীর কুশপুতুল দাহ করার পরে আমরা দুই সংগঠনের নেতৃত্বরা ঘোষণা করেছি কর্মসূচি শেষ। এবার প্ল্যাকার্ড ফেস্টুন গুটিয়ে কমরেডদের ঘরে ফেরার পালা। হঠাৎই পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্তার নেতৃত্বে শুরু হয় ব্যাপক গালিগালাজ। এই প্ররোচনা অবশ্য শুরু থেকেই ছিল। তারপর দেখলাম, হঠাৎ করেই এক ছাত্রী কমরেডের গায়ে ধাক্কা দেয় এক পুরুষ পুলিশকর্মী। খুব স্বাভাবিকভাবেই উত্তেজিত হয়ে পড়ে উপস্থিত ছাত্র-যুব কর্মীরা। পুলিশ এর সুযোগ নিয়ে ব্যাপক মারধর, গালিগালাজ শুরু করে আমাদের। ছেলেমেয়ে নির্বিশেষে এই আক্রমণের শিকার হয়। ছাত্রী-যুবতীদেরকেও নির্বিচারে আক্রমণ করে পুরুষ পুলিশ। এরপর শুরু হয় ভ্যান-এ তোলা। শতাধিক কর্মী নেতৃত্বকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভ্যান-এ তোলার সময় কার্যত ছয়-সাতজন পুলিশ মিলে এক একজনকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় গাড়ির মধ্যে। লক-আপ-এ যাওয়ার এবং থাকার অভিজ্ঞতা আগেও হয়েছিল। কিন্তু এবার যাওয়ার থেকেই দেখলাম প্রশাসন নিয়মের প্রয়োগে যেন একটু বেশিই তৎপর। কিন্তু যে কমরেডরা আহত অবস্থায় গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদের চিকিৎসার জন্য কোনো ত‌ৎপরতাই দেখা গেল না। প্রমা, পৃথা, অহনা, প্রশান্ত, নিখিলদা, অরূপ, কলতান সহ আমরা একাধিক কমরেড তখন আহত অবস্থায় কাতরাচ্ছি। কেউ যন্ত্রণায় ছটফট করছে, কারোর মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে, কেউ বমি করছে — পুলিশ কর্তৃপক্ষের কোনো হেলদোলই নেই। পুলিশের আধিকারিকদের সাথে একপ্রস্থ কথা কাটাকাটির পরে হাসপাতালে যাওয়ার ব্যবস্থা হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে ফিরে এসে দেখি, অ্যারেস্ট মেমো লেখা হচ্ছে। হাতে গোনা কয়েকজন কমরেড, যাদের বাড়িতে বিশেষ কোনো অসুবিধা আছে, তারা ছাড়া সবাই লক-আপ থেকে বেল বন্ডে সই করে বেরোতে রাজি হয়নি। পরের দিন ২টো নাগাদ আমাদেরকে কোর্টে নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়। অদ্ভুতভাবে চারজন ছাত্রযুব কমরেড অর্থাৎ সায়নদীপদা, ইন্দ্রদা, সোহম, সন্দীপন এই চারজনকে ডাকার পরেই, অহনা, আমি, রূপসা ও অনন্যা-র নাম ধরে ডেকে বলা হয় সায়নদীপদাদের সাথে একই গাড়িতে উঠতে হবে। বুঝতে পারি, পুলিশ আমাদেরকে টার্গেট করতে চলেছে এবং সম্ভবত আমাদের নামেই মামলা দায়ের করছে প্রশাসন। কোর্ট-এ তোলা হয় আমাদের আটজনকে। কিছুক্ষণ বাদে আইনজীবী এবং নেতৃত্বদের কাছ থেকে জানতে পারি, যে আমাদের ৮ জনকে চার দিনের জেল হেপাজত দেওয়া হয়েছে। শুনেই প্রথম যে কথাটা আমাদের চারজনেরই অনুভূতি ছিল — ‘আমরা গর্বিত।’ আমাদেরকে কোর্ট লক-আপ-এর পুলিশ কর্মীরা নিয়মানুসারেই ঘড়ি, ফোন, ব্যাগ এসব রেখেই জেলে যেতে হবে বলে জানান। বাইরে উৎকণ্ঠা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা অভিভাবক ও কমরেডদের কাছে সেসব দিয়েই সাড়ে সাতটার পরে আমাদের ৮ জনকে প্রিজন ভ্যান-এ তোলা হয়। তখন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছে। কোর্ট চত্বরে কয়েকশো কমরেড। কারোর চোখে উৎকণ্ঠা, কারোর চোখে ক্ষোভ, রাগ, যন্ত্রণা যেন একসাথে ঝরে পড়ছে। শপথে দৃপ্ত স্লোগানের আওয়াজ তখন মুষলধারে বৃষ্টির আওয়াজকে ছাপিয়ে গেছে। বৃষ্টিভেজা স্লোগানমুখর ঐ সন্ধ্যায় কয়েকশো মুষ্টিবদ্ধ হাত, একজন কমরেড-এর হাতে স্বাধীনতা গণতন্ত্র সমাজতন্ত্র লেখা একটা পতাকা আর কয়েকশ জোড়া চোখ-এর ওই স্মৃতি আমার তো বটেই বোধহয় আমাদের ৮ জন-এর কাছেই অত্যন্ত মূল্যবান একটা স্মৃতি, যা জেলে থাকা ওই চার দিন আমাদেরকে মানসিকভাবেই থাকতে সাহায্য তো করেছেই। ভবিষ্যতেও বহু কঠিন পরিস্থিতির মোকাবিলায় মানসিক শক্তি জোগাবে।

madhuja3
রাত ৮টা, আমাদের চারজন ছাত্রীকে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানো হলো আলিপুর মহিলা সংশোধনাগারের সামনে, সংশোধনাগার-এর অফিসে ঢোকার সময় থেকেই একটা অদ্ভুত তাচ্ছিল্য মেশানো দৃষ্টি ঘিরে রেখেছিল আমাদের। নাম-ধাম শিক্ষাগত যোগ্যতা লেখার পর শুরু হয় দেহ-তল্লাশি। একটা চারিদিক ঘেরা ছোটো ঘরে একজন একজন করে নিয়ে যাওয়া হয় আমাদেরকে, একজন মহিলা জেলকর্মী তল্লাশি শুরু করেন। অহনাকে বলা হয় জামাকাপড় খুলতে হবে। রাজি হয়নি ও। ওকে আর জোরও করেনি ওরা। এরপর আসে আমার পালা। ওড়নাটা ঝেড়ে দেখে মাটিতে রাখা হলো প্রথমে। এরপর বলা হলো কামিজ খুলতে হবে। রাজি হচ্ছিলাম না কিছুতেই। বাধ্য করা হলো কামিজ খুলতে এবং একইভাবে সালোয়ারও খুলতে বাধ্য করা হলো। যাবতীয় অসম্মানকে চোয়াল শক্ত করে উপেক্ষা করার চেষ্টা করছি তখন। আর আমার রাষ্ট্রের নির্লজ্জ দুটো হাত তখন ঊর্ধ্বাঙ্গের অন্তর্বাসের তলায় হাত ঢুকিয়ে যেন খোঁজার চেষ্টা কর‍‌ছে নিষিদ্ধ কিছু। জিজ্ঞাসা করা হলো আমি তখন রজস্বলা কিনা। বললাম হ্যাঁ। এরপর এলো আরও মারাত্মক নির্দেশ। বলা হলো নিচু হয়ে নিম্নাঙ্গের অন্তর্বাস খুলতে হবে। হতচকিত আমি শুধু জিজ্ঞাসু দৃষ্টি ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলাম ‘‌অ্যাঁ!’ বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মৃদু অথচ তীক্ষ্ণ গলায় একই নির্দেশ এলো আবার। বাধ্য করা হলো নিচু হয়ে অন্তর্বাস খুলতে। তখন শুধু শরীর থেকে নয় রক্ত ঝরছিল আমার সমস্ত মনন সমস্ত চেতনাজুড়েই। ক্ষতবিক্ষত মনটাকে সামলে নিতে হলো মুহূর্তের মধ্যেই। বাইরে বেরিয়ে এলাম হাসিমুখেই। এরপর ক্রমান্বয়ে রূপসা এবং অনন্যা। ওদেরও ওজর আপত্তিগুলো জেলকর্মী মহিলাটি ইচ্ছেমতন শুনলেন এবং শুনলেন না। তারপর নিয়ে যাওয়া হলো জেলের ভেতরে। আমাদের আইনজীবীরা কোর্টে মৌখিক আবেদন জানিয়ে ছিলেন যে, আমাদেরকে যেন রাজনৈতিক বন্দির মর্যাদা দেওয়া হয়। তাই ভেতরে যাওয়ার আগে এক মহিলা আধিকারিকের কাছে জানতে চাই যে, আমাদের সেই আবেদন মঞ্জুর হয়েছে কিনা। তিনি তির্যক স্বরে আমাদেরকে বললেন, থাকবে তো মোটে চার‍‌ দিন। রাজনৈতিক বন্দি হয়ে কি হবে? উত্তর দিয়েছিলাম, কি হবে আর কি হবে না সেটা আমরা বুঝব। আপনি শুধু দেখুন অর্ডারটা এসেছে কিনা। জানতে পারলাম, অর্ডার আসেনি। আর তখনই বোধহয় ঠিক হয়ে গিয়েছিল, জেলের ভেতরে আমাদের জন্য বিশেষ কিছু ব্যবহার অপেক্ষা করে থাকবে।
রাত তখন প্রায় সাড়ে আটটা। হাতে থাকা খাবার বাইরে ফেলে, বোতলের জল খেতে খেতেই জেলের ভেতরে ঢুকলাম। তখনও বুঝিনি, এ এক অন্য লড়াইয়ের সূচনা মাত্র। নিয়ে যাওয়া হলো তিন নম্বর ঘরে। ওটাকে বলা হয় আমদানি ঘর। সেই আমদানি ঘরে ঢোকামাত্র একটা বোঁটকা গন্ধ এসে নাকে ধাক্কা মারলো। গুলিয়ে উঠল সমস্ত শরীর, একটা অপর্যাপ্ত আলোর ঘরে জনা ২৫-৩০ মহিলা ও শিশু দু’দিকে সার দিয়ে শুয়ে আছে। মাঝখান দিয়ে হেঁটে যাওয়ার মতন কিছুটা জায়গা। বাথরুমের সামনে একটু ফাঁকা জায়গা। চারজন গিয়ে দাঁড়ালাম সেখানে। রুমের ‘মেড’ নির্দেশ দিলেন হাত পা ধুয়ে আসতে হবে। হাত পা ধুচ্ছি, তখনই বলা হলো কেন তাড়াতাড়ি করছি না। সারাদিনের ক্লান্তি আর বিরক্তিকে সাথে নিয়ে অবসন্নতা যেন সারা শরীর আর মনের ওপর চেপে বসেছে। সামান্য কথা হতেই বুঝলাম হাওয়া বিশেষ ভালো না। ‘মেড’-এর এক সঙ্গীনী কোমরে আঁচল গুঁজে আধা হিন্দি আধা বাংলায় কথা বলতে বলতে তেড়ে এলেন। আমরা চুপ করলাম। এর মধ্যেই তাকিয়ে দেখি রূপসা আর অনন্যা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। মুহূর্তের মধ্যে অহনা ভীষণ অসহায় গোবেচারা মুখ ও গলার স্বর নিয়ে মেড-এর উদ্দেশে বলে উঠলো ‘পিসিমা একটু শুনবেন!’ ব্যাস! সন্ধির রাস্তা তৈরি হওয়া শুরু হলো। মেড এবং তার সাথীরা আমাদের তিনজনের খুব নিন্দা করে এবং অহনার প্রতি প্রশংসার বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিয়ে এরপর আমাদের করণীয় কী সে সম্পর্কে বলতে লাগলেন। যাইহোক, আমাদের থালা, বাটি, গ্লাস, কম্বল এবং খাবার জুটল। কোনোরকমে খেয়ে ওই খাবার নেওয়ার পর শোওয়ার জায়গা বরাদ্দ হলো। প্রতি জনের মাথাপিছু তিনটি করে কম্বল। একটা কম্বল দুভাঁজ করে পেতে একটা মাথায় দিয়ে আর একটাতে গায়ে দেওয়ার জন্য বরাদ্দ করলাম আমরা। দুই সারির একটি সারির মধ্যে শোওয়ার জায়গা হলো অনন্যার। চোট পাওয়া পা নিয়ে অহনা, রূপসা এবং আমার শোওয়ার জায়গা হলো মধ্যবর্তী যাতায়াতের রাস্তাটিতে। এখানে বলে রাখা ভালো ‘মেড’ কে? সংশ্লিষ্ট ঘরে বসবাসকারী আসামি ও অভিযুক্তদের মধ্যে থেকে একজনকে মেড হিসাবে ঠিক করে দেওয়া হয় জেল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে। সাধারণত যাবজ্জীবন বা বহুদিনের জন্য সাজাপ্রাপ্ত আসামিদেরকেই মেড হিসাবে ঠিক করা হয়।
১১ তারিখ, সকাল ছ’টা। আমাদের চারজনের জন্যই একটা অজানা সকাল। দেরি করে ঘুম থেকে উঠতে অভ্যস্ত এই চারজনকেই প্রায় ধাক্কা মেরে তুলে দেওয়া হলো। মেড-এর চিৎকার শুনলাম। ‘গিনতি হবে এ-এ-এ-এ-এ। জোড়ায় জোড়ায় বস।’ এক নিমেষে ঘুমটা কর্পূরের মতন উবে গেল। জোড়ায় জোড়ায় বসলাম। আমার সামনে অহনা আর অনন্যা এবং পাশে রূপসা। জেলকর্মী এলেন খাতা নিয়ে। ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে জোড়ায় জোড়ায় বসে থাকা মানুষগুলোর গুনতি হলো। জানলাম ৩নং ঘরে ২৭জন মহিলা আর ৭টি বাচ্চা আছে। ‘৪টে ছেলে তিনটে মেয়ে‌।’ গুনতি করে আবার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হলো। যাই হোক, পৌনে সাতটা নাগাদ ভোঁ পড়তেই বাইরে বেরিয়ে এলাম। আমরা তো নতুন। তাই অভিভাবকও অনেক। আমাদের মধ্যে কে জল আনবে আর কে আনবে না তাই নিয়ে নির্দেশ দেওয়া শুরু হলো। মেজাজ হারিয়ে অনন্যা একটা কথা বলে উঠতেই — রে রে করে তেড়ে এলো বাকি বাসিন্দারা। অহনা তখন অনন্যাকে আড়াল করে বারান্দার ওপর দাঁড়িয়ে। নিচ থেকে আমি আর রূপসা সমানেই অনন্যাকে থামতে বলছি। ব্যাস চিৎকার চ্যাঁচামেচিতে জেলকর্মীরা হাজির। যা করেছি এবং যা করিনি সবটাই নালিশ হলো। আমিও আমাদের কথা বলার চেষ্টা করলাম। বললাম, কাল রাত থেকেই দুর্ব্যবহার করা হচ্ছে। বুঝলাম বিশেষ কাজ হলো না। পরিস্থিতি একটু ঠান্ডা হওয়ার পর অহনা জলের খোঁজে গিয়ে শুনে এলো জেল কর্মীরা আমাদের মেডকে বলছেন যে, আমাদের সাথে যেন ইচ্ছাকৃতভাবে খারাপ ব্যবহার করা হয়। আমাদের কোনো ভালো কথাতেই যেন না ভোলেন ওই মহিলা। আমরা নাকি ডেঞ্জারাস। ও এসে বলার পর বুঝলাম, এখানে চারদিন টিকে থাকা এবং তারপর মানসিক ও শারীরিক সুস্থতার সাথে এখান থেকে বেরিয়ে ১৪ তারিখ কোর্টে পৌঁছানোই এখন পাখির চোখ। নিজেরাই নিজেদেরকে বোঝালাম, ভাঙলে চলবে না। কৌশল করে বাঁচতে হবে এখানে। এরপর ন’টা নাগাদ চা এলো। সে চা-এর স্বাদ, গন্ধ এবং বর্ণ সবটাই বর্ণনার অতীত, এর আগে ৮টার সময় ‘বিস্কুট ধরে নিলাম’ আমরা। যে মেড একটু আগে নালিশ করে এসেছেন তিনিই তখন বরাদ্দের থেকে দুটো বেশিই বিস্কুট দিলেন। যাই হোক, চা-এর সাথে জুটলো আগের দিনের বাসি রুটি। চা আর রুটি খেয়ে কিছুটা ফ্রেস হয়ে বেরিয়ে পড়লাম ঘরের বাইরে। আলাপ হলো দু’নম্বর ঘরে থাকা শর্মিষ্ঠাদি’র সাথে। ভাঙড়কাণ্ডে যাঁকে অ্যারেস্ট করেছে সরকার। ওর কাছ থেকেই জানলাম লাইব্রেরি আছে জেলে। বই তোলা যায় সেখান থেকে। জানলাম অন্যান্য নিয়মকানুন। এরপর ডাক এলো ‘কেস-টেবিল’-এর জন্য। চারজনে মিলে গেলাম সেখানে। নাম ধাম জিজ্ঞাসা করে একটা বড় খাতায় লিখে নেওয়া হলো। তার সাথে শনাক্তকরণের চিহ্ন। জানা গেল যে সমস্ত অভিযুক্তরা উকিলের ব্যবস্থা করতে পারেন না, তাঁদেরকে ওখান থেকেই সাহায্য করা হয়। এরপরে সাড়ে এগারোটা নাগাদ আমাদের ডাক পড়লো — ‘ইন্টারভিউ’ হবে। — অর্থাৎ কিনা বাড়ি থেকে দেখা করতে এসেছে। যাওয়ার আগে নিজেদের মধ্যে কথা বললাম। ঠিক করলাম যে, আমরা যে অবস্থাতেই থাকি না কেন, তা বাইরে বলা যাবে না। কারণ আমরা জানতাম, ভেতরে এতটুকু কষ্ট হচ্ছে জানতে পারলে আমাদের রক্তের সম্পর্কের পরিবার শুধু নয়, অগণিত কমরেড নিয়ে তৈরি যে বিশাল পরিবারের আমরা সদস্য, তার প্রতিটি মানুষ কষ্ট পাবেন, অধৈর্য হবেন। তাই হাসি মুখে গিয়ে দাঁড়াতে হবে, ওদের সামনে। ইন্টারভিউ রুমে লোহার জালির ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মুখগুলো তখন আকুল হয়ে আছে শুধু এটুকু জানার জন্য যে, আমরা কেমন আছি। সবাই মিলে উল্লসিত স্বরে জানিয়ে দিলাম, মোটের ওপর ভালোই আছি। বিশেষ সমস্যা নে‍‌ই। ফিরে এলাম আবার ঘরের দিকে। ডাক পড়লো, জামা-কাপড়সহ অন্যান্য জিনিসপত্র দিয়ে যাওয়া হয়েছে বাড়ি থেকে। আমি আর অহনা গেলাম নিয়ে আসতে। লিস্টটা মিলিয়ে দেখলাম, বিস্কুটের প্যাকেট ভেতরে আনার অনুমতি পে‍লেও স্যানিটারি ন্যাপকিনের প্যাকেট আনতে দেওয়া হয়নি। দুপুরের ভাত ঘরেই দেওয়া হলো আমাদের (নতুন বলে) খেয়ে দেয়ে উঠে জানতে পারলাম, ১টার সময় আবার গুনতি করে বন্ধ করে দেওয়া হবে।

madhuja sen roy

৩টের সময় ছাড়া পাব। কম্বল বিছিয়ে আধশোওয়া হয়ে গল্প জুড়লাম আমরা। আলোচনার বিষয় অবশ্যই যারা দেখা করতে এলো, তাঁদেরকে কেমন দেখলাম। তিনটে থেকে সাড়ে পাঁচটা বাইরে ঘুরে বেড়ানোর পর আবার আমাদের বন্দি করা হলো। এর মধ্যেই ৪টে নাগাদ খবর এলো আবার কেস টেবিল-এ যেতে হবে। কেস টেবিলে যাবার সময় জানতে পারলাম কোনোভাবেই ওড়না ছাড়া অফিস ঘরে যাওয়া যাবে না। সাধারণভাবে যে পোশাককে যথেষ্ট শালীনতার মর্যাদা দেয় এই সমাজ সেই ক্ষেত্রে কেন ওড়না নিতে হবে, বুঝতে না পেরে প্রশ্ন করায়, নারী পাচারকারী, শিশুপাচারকারী থেকে খুনি সবাই মিলেই আমাদের প্রতি জ্ঞান বিতরণে উদ্যোগী হয়ে পড়লো। উপায়ান্তর না দেখে ওড়না ধার করেই অফিসে গেলাম। এক সহৃদয় জেলকর্মী জিজ্ঞাসা করলেন কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা, বিশেষ কিছু ‘requirement’ আছে কিনা। আমরা শুধু একঘরে থাকতে চেয়েছিলাম। আমাদের জানিয়ে দেওয়া হয়, শুধুমাত্র সরকারবিরোধী হওয়ার কারণেই এ অনুরোধ কোনোভাবেই রাখা সম্ভব নয়। আমরা আবারও বুঝলাম, ভেতরের লড়াইটা আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে চলেছে। এরইমধ্যে দোলের দিন সকালে অর্থাৎ ১২ তারিখ নির্দেশ এলো ‘মেড’-এর পক্ষ থেকে রঙ খেলতেই হবে। ওদের বোঝাতে পারলাম কিনা জানিনা, তবে এক ফোঁটা রং-ও গায়ে লাগাতে দিলাম না। কারণ জানতাম, বাইরে কমরেডরা কেউ রঙের ছোঁয়াটুকুও লাগায়নি। বারো তারিখ বিকেলেই ঘর আলাদা হয়ে গেল। অহনার ৪, আমার ৫, অনন্যার ৮ এবং রূপসার জন্য ১০ নং ঘর বরাদ্দ হলো। এই ঘরে পৌঁছানোর পর অভিজ্ঞতাটা আরও খারাপ হলো। রূপসার ঘরে ছিল পাঁচটি খুনে সাজাপ্রাপ্ত একজন অপরাধী। আমাদের ঘরগুলোতেও ছিল নারী, শিশু পাচারকারী, খুনি অপরাধীরা। প্রথমদিন থেকেই অবশ্য এই ধরনের অপরাধীধের সঙ্গে আমাদের থাকতে দেওয়া হয়েছিল। অহনার ঘরের মেড অকথ্য গালিগালাজ দিতে দিতে পরিষ্কার জানিয়েই দিল জেলকর্মীরা নির্দেশ দিয়েছে যেন আমাদেরকে খারাপ রাখা হয়। আমার ঘরের মেড অবশ্য বুদ্ধিমান। মুখে বিশেষ কিছু বলল না। কিন্তু নিজের খারাপ ব্যবহারে যা বোঝানোর বুঝিয়ে দিলেন। ঘরের কেউ যেন আমার সাথে বিশেষ কথা না বলে, সেটাও নির্দেশ ছিল মেড-এর পক্ষ থেকে।
একই দিনের অভিজ্ঞতায় এটুকু মনে হলো, ওটা কোনোভাবেই সংশোধনাগার নয়, বরং ট্রমা সেন্টার। অপরাধীর সং‍‌শোধন তো দূরের কথা, ওখানকার পরিবেশ কম অপরাধীকে দাগী অপরাধী বানিয়ে ছাড়তে পারে।
১৪ই মার্চ, সকাল থেকেই আমরা উদগ্রীব। কো‍‌র্টে যেতে হবে। কোর্টে নিয়ে আসার সময় আমাদের আবার চেক করা হয়। জেলের ভিতরে যেখানে অভিযুক্ত এবং আসামিদের রাখা হয়, সেখানে জেল কর্মীদের যে অফিস ঘরটি আছে সেই ঘরের সামনে এই চেকিং হয়। ওখানে উপস্থিত সমস্ত মানুষের সামনেই একজন মহিলা জেলকর্মী যেভাবে পোশাকের উপর দিয়েই অশালীনভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালায়, তা অত্যন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলেছিল। প্রতি মুহূর্তেই মনে হচ্ছিল শ্লীলতাহানি করা হচ্ছে।
হ্যাঁ ১৪ই মার্চ। বেলা আড়াইটে জামিনে মুক্ত হলাম আমরা। যাবতীয় কষ্ট, যন্ত্রণা, খারাপ লাগা মুহূর্তের মধ্যে উবে গেল with love Inquilab-এর ধ্বনিতে। কমরেডদের আবেগ, ভালোবাসা আর লাল আবিরের উচ্ছ্বাসে ভেসে গেল সমস্ত খারাপ লাগা। আমরা জানি এই সব অত্যাচার ওরা করেছে, একটাই উদ্দেশ্য নিয়ে, যাতে আমরা ভেঙে পড়ি, দুর্বল হয়ে পড়ি মানসিকভাবে। কিন্তু ওদের ‘সং‍‌‍‌শোধনে’র পদ্ধতি যতোই খারাপ হোক না কেন, তার জোর আমাদের সাদা পতাকাটা আর স্বাধীনতা গণতন্ত্র সমাজতন্ত্রের আদর্শের থেকে কখনই বে‍শি নয়। তাই চাকরিতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সাথে সাথে আরও একটা যুদ্ধ শুরু হলো। জেলের ভেতরে আমাদের সাথে ঘটে যাওয়া সব অন্যায়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ। এযুদ্ধে জয় আমাদেরই হবে, কারণ আমাদের শক্তি মুষ্টিবদ্ধ হাতে, স্লোগানে, লাল আবিরে আর সাদা পতাকার লাল তারার মধ্যেই রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

4 × 4 =

You might also like...

taxi

হাওড়া স্টেশন নিয়ে প্রশাসনের হেলদোল নেই

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk