Loading...
You are here:  Home  >  রাজনীতি  >  জাতীয়  >  Current Article

মৌলবাদ বনাম মনুবাদ : ভয়ঙ্কর আগামীর ইঙ্গিত

By   /  March 21, 2017  /  No Comments

সত্রাজিৎ চ্যাটার্জি

উত্তরপ্রদেশের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলে কেন্দ্রের বর্তমান ক্ষমতাসীন দলবিজেপি–‌র একচেটিয়া আধিপত্যের পরে “কোন পথে ভারতবর্ষ” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে লিখেছিলাম যে আগামীদিনে ১৩০ কোটির দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব বজায় থাকবে কি ? নাকি এই ফলাফলে উগ্র, ধর্মান্ধ, হিন্দুত্বের ধ্বজাধারীরা উল্লসিত হয়ে এর পর সারা দেশেই ধীরে ধীরে সাম্প্রদায়িকতা ও বিভাজনের বীজ বপন করতে সচেষ্ট হবে? সেই আশঙ্কাই সত্য হওয়ার পথে প্রথম পদক্ষেপ উত্তরপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী পদে উগ্র সাম্প্রদায়িকতার মুখ তথা গোরক্ষপুরের দাঙ্গার মদতদাতা যোগী আদিত্যনাথকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বেছে নেওয়া। কোনও সন্দেহ নেই, গেরুয়াধারী এই সন্ন্যাসীর হাত ধরেই মনুবাদ দেশের সর্বাধিক জনসংখ্যার এই রাজ্য থেকেই সারা ভারতবর্ষে ধীরে ধীরে তার বিষ-বাষ্প ছড়িয়ে দেবে। এবং একথা বলারও অপেক্ষা রাখে না যে মনুবাদের এই প্রভুত্ব বিস্তার যে দেশের অ-বিজেপি শাসিত প্রদেশে মৌলবাদকে আরও বেপরোয়া করে তুলবে এবং ফলস্বরূপ অচিরেই সারাদেশে মনুবাদের সাথে তীব্র সংঘাতের পথ প্রশস্ত করবে আর তার মাশুল দিতে হবে অবশ্যই দেশের সাধারণ মানুষকে।

yogi4

গেরুরাধারী এই সন্ন্যাসী যোগী আদিত্যনাথকে নিয়ে বিতর্কের অন্ত নেই। তিনি একাধারে গোরক্ষপুরের গোরক্ষনাথ মন্দিরের পীঠাধীশ্বর বা মহন্ত এবং স্বীয় প্রভুত্ববলে গোরক্ষপুর লোকসভা কেন্দ্র থেকে টানা ৫ বারের সাংসদ নির্বাচিত। উগ্র হিন্দুত্ববাদের মুখ তথা দাঙ্গার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ মদতদাতা হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। কখনও তিনি মৃত মুসলিম নারীর দেহকে কবর থেকে তুলে এনে ধর্ষণ করার নিদান দেন। কখনওবা সাম্প্রদায়িকতার জিগির তুলে উত্তরপ্রদেশ–‌সহ গোটা ভারতবর্ষকেই হিন্দুরাষ্ট্র ঘোষণা করার পক্ষে জোরালো সওয়াল করেন। ভারতবর্ষ তথা বিশ্বশান্তির মূর্ত প্রতীক মাদার টেরেসার নামেও কুৎসা ছড়াতে তিনি দ্বিধাবোধ করেন না। মাদার টেরেসা সেবার নামে ভারতবর্ষে থেকে হিন্দুদের খ্রীষ্টান ধর্মে দীক্ষিত করতেন, এমনই তার দাবি! অথচ বাংলা তথা ভারতবর্ষের অনাথ, দুঃস্থ শিশুদের পাশে দাঁড়িয়ে মাতৃত্বের স্নেহবন্ধনে তাদের লালন করে মাদার টেরেসা যে অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন তার স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি সর্বশ্রেষ্ঠ পুরস্কার ‘‌নোবেল’‌ লাভ করেন। আর পক্ষান্তরে এই উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ন্যাসী ২০০৫ সালে বলপূর্বক ৫০০০ অ-হিন্দু মানুষকে হিন্দু ধর্মে রূপান্তরিত করেছিলেন। দেশে জোর করে ধর্মান্তকরণের প্রক্রিয়া হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়েই রয়েছে। এই অসুস্থ সমাজ ব্যবস্থায় দাঁড়িয়ে এই গেরুয়াবসন সন্ন্যাসী সাংসদ সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলানোর পরিবর্তে হুমকি দেন,‘‌ওরা একজন হিন্দু মেয়েকে ধর্মান্তরিত করলে, আমরাও ১০০ মুসলিম নারীকে ধর্মান্তরিত করব।’‌ উত্তরপ্রদেশে বারংবার দাঙ্গার নেপথ্যে তিনি মুসলিমদের দায়ী করে তিনি তদানীন্তন ক্ষমতাসীন দল সমাজবাদী পার্টিকেই দোষারোপ করেন। অথচ গোরক্ষপুরে সংঘটিত দাঙ্গার নেপথ্যে তিনিই ছিলেন মাস্টার মাইণ্ড। অতীতে ১৯৯৯ সালে সমাজবাদী পার্টির সদস্য তালাত আজিজের ওপর গুলি চলানোর অভিযোগ উঠেছিল তাঁরই সঙ্গীদের বিরুদ্ধে। ২০০২ সালে তাঁর নিজের হাতে তৈরি হিন্দু যুব বাহিনী সদস্যদের বিরুদ্ধে হিংসায় মদত দেওয়া, লাভ জিহাদের অভিযোগও উঠেছিল। এছাড়াও এরা একবার ট্রেন, বাস পোড়ানো ও মসজিদের অগ্নি-সংযোগের মত ভয়ঙ্কর দুষ্কর্মে লিপ্ত হয়েছিল যখন তাদের গুরু এই যোগী আদিত্যনাথ প্ররোচনামূলক মন্তব্য করে গ্রেফতার হয়েছিলেন এবং ১৫ দিন কারাবাস করেছিলেন। ২০১৫ সালে দেশজুড়ে চলা “অসহিষ্ণুতা”র বিরুদ্ধে মুখ খোলায় তিনি জনপ্রিয় অভিনেতা শাহরুখ খানকে ‘‌পাকিস্তানের দালাল’‌ বলে তাঁকে মৌলবাদী নেতা হাফিজ সইদের সাথে তুলনা করেছিলেন। তিনি এও বলেছিলেন, ‘‌ভারতীয়রা শাহরুখের সিনেমা দেখা বন্ধ করলে তার অবস্থা রাস্তার ভিখারীর মতই হবে’‌। ওই বছরেই তিনি যোগাভ্যাস করতে বা সূর্য প্রণাম করতে অস্বীকার করলে তাদের “হিন্দুস্থান” বা ভারতবর্ষ ছেড়ে চলে যাওয়ার নিদান দেন। বিভিন্ন সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করা বা দাঙ্গার ইন্ধন জোগানো বা উস্কানিমূলক কথাবার্তা বলে তিনি বারবার সংবাদপত্রের শিরোনামে এসেছেন এবং সাংসদ হওয়ার কারণে বা অন্য যে কোনও কারণেই হোক পার পেয়ে গিয়েছিলেন।

yogi5

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাতটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশের নাগরিকদের আমেরিকা প্রবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির সিদ্ধান্তের তিনি পূর্ণ সমর্থন করেন এবং ভারতবর্ষের মতো ধর্মনিরপেক্ষ দেশেও সেই নিয়ম বলবৎ করার দাবী রাখেন। এছাড়াও যোগী আদিত্যনাথের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টা, হিংসায় মদত দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে বেশ কিছু মামলা আজও আদালতে বিচারাধীন। এই আদিত্যনাথই উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের আগে রামমন্দির গড়ে তোলার কথা বলে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন এবং এও বলেছিলেন যে সমাজবাদী পার্টি নির্বাচনে জয়লাভ করলে উত্তরপ্রদেশে কবরস্থানের সংখ্যা বাড়বে উত্তরোত্তর। এ হেন একজন উগ্র ধর্মান্ধ ব্যক্তির হাতে দেশের সর্বাধিক জনসংখ্যার প্রদেশের শাসনভার ন্যস্ত করা প্রকারান্তরে দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব রক্ষার পথে অন্তরায়ই শুধু নয় বরং তা আগামী ভারতবর্ষের পক্ষে এক ভয়ঙ্করতার ইঙ্গিতবাহী। এদের হাতে মনুবাদের বীজ উপ্ত হয়ে তা ছড়িয়ে পড়ে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। উত্তরপ্রদেশে ঐতিহাসিক বাবরি মসজিদ ধূলিসাৎ হওয়ার পেছনেও এই গৈরিক ধর্মান্ধ, বিকৃত রুচির নরপশুদের প্রত্যক্ষ ইন্ধন ছিলো। সুতরাং আগামী ভারতবর্ষের পক্ষে তা যে সর্বান্তকরণেই অশোভন, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
এই মনুবাদের নিরঙ্কুশ আধিপত্যের দিনে মৌলবাদও যে তার অস্তিত্ব রক্ষার তাগিদে মরিয়া হয়ে উঠবে এবং অ-বিজেপি শাসিত বা এই উগ্র হিন্দুত্ববাদ বর্জিত রাজ্যগুলিতে যেখানে মনুবাদ অপেক্ষাকৃত দুর্বল সেখানে সঙ্ঘবদ্ধভাবে আঘাত হানবে, তা প্রত্যাশিত। এর বিষময় ফল হিসেবে দেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষের শান্তি বিঘ্নিত হওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রা যে দুর্বিষহ হয়ে উঠবে, তাও একপ্রকার নিশ্চিত। সর্বাপেক্ষা বেশি প্রভাবের তালিকায় পশ্চিমবঙ্গে বা বাংলাও রয়েছে নিঃসন্দেহেই, যেখানে ২৭% সংখ্যালঘুর বাস। সবচেয়ে বড় কথা, যেখানে বাংলার মুখ্যমন্ত্রীর দোয়া বা তোষণ বা আনুকূল্য রয়েছে এই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপরে। উত্তরপ্রদেশ সহ গোটা ভারতবর্ষের সিংহভাগ রাজ্যে উগ্র হিন্দুত্বের প্রভাব অ-বিজেপি শাসিত বাংলায় মুসলিমদের আরও বেপরোয়া করে তুলবে এবং নারী নির্যাতন, রাহাজানি, খুন, ধর্ষণ, তোলা আদায় ইত্যাদি গর্হিত কাজে তারা আরও লিপ্ত হবে প্রতিশোধের স্পৃহাতে। তা ছাড়া রাতের অন্ধকারে মন্দিরে ঢুকে লুঠতরাজ চালানো, হিন্দু দেবদেবীর মাথা ভেঙে নিয়ে যাওয়া, সরস্বতী পুজোয় বাধা দেওয়া, বিজয়া দশ্মীর দিন প্রতিমা বিসর্জনের কর্মসূচীতে হিন্দুদের ওপর হামলা করা বা মন্দির প্রাঙ্গণে গোমাংস ছড়িয়ে রাখার মত সাম্প্রদায়িক কার্যকলাপ তো আরও বৃদ্ধি পাবেই। সুতরাং এই দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক বিদ্বেষ বিতৃষ্ণা যে ঘি ঢালা আগুনের মতই আরও জ্বলে উঠবে তা সহজেই অনুমেয়। আর তাছাড়া জীবন ও জীবিকার তাগিদে যে সমস্ত ভারতীয়- (ধরা যাক হিন্দু) মুসলিম প্রধান দেশ মানে ইরাক, ইরান বা আরব রাষ্ট্রগুলোতে বাস করে, তাদের ওপরেও অচিরেই নেমে আসতে পারে জীবন কেড়ে নেওয়ার মত আঘাত। বাবরি মসজিদ ধূলিস্যাৎ হওয়ার পরে এই দেশগুলিতে প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধ স্বরূপ পরিবারসমেত বা পরিবার-পরিজন বর্জিত কত ভারতীয় হতভাগ্যের মৃত্যু হয়েছিল, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। সুতরাং মনুবাদ ও মৌলবাদের এই অবশ্যম্ভাবী সংঘাত ১৩০ কোটির দেশে বিভাজনের রাজনীতিকেই যে আরও প্রকট করবে এবং হিন্দু ও মুসলিম দুই সম্প্রদায়ই দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্ব ভেঙেচুরে তছনছ করে অচিরেই যে পরস্পরের জাতি শত্রুতে রূপান্তরিত হবে, সেই অসুস্থ সমাজ, সংস্কৃতি এবং ঐক্য-সংহতির ক্ষেত্রে ভয়ঙ্করতার বীজ প্রোথিত হল উত্তরপ্রদেশেই। ভারতীয় সমাজ, সভ্যতার ওপর আজ থেকেই সেই অশনি সংকেত দেখা দিল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

10 + 13 =

You might also like...

solan3

চোখ ধরেছে মেঘের ছাতা

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk