Loading...
You are here:  Home  >  ওপেন ফোরাম  >  Current Article

মুক্ত চেতনা ও বদ্ধ সংস্কারের লড়াই

By   /  March 25, 2017  /  No Comments

সত্রাজিত চ্যাটার্জি
গত কয়েকদিন রাজনীতিপ্রিয় বাঙালির রাজনৈতিক আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল এই সময়ের অন্যতম জনপ্রিয় কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের সোশ্যাল মিডিয়াতে লেখা একটি কবিতাকে নিয়ে। কবিতাটিতে শ্রীজাতবাবু তাঁর লেখায় হিন্দু ধর্মের প্রতি অবমাননা করেছেন এবং হিন্দু ভাবাবেগে চরম আঘাত হেনেছেন, এটাই বিরুদ্ধাচরণকারীদের মত। তাদের মধ্যে একজন অতিশয় ধর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি আবার শ্রীজাতর নামে থানাতে এফ.আই.আর পর্যন্ত করে ফেলেছেন। তা ছাড়াও শ্রীজাতবাবুর সেই কবিতাটিকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে তাঁর বিরুদ্ধাচরণকারীরা ভাষা, সংস্কৃতির শালীনতা, সভ্যতা বজায় না রেখে অন্তরের যাবতীয় ঘৃণা উগরে দিয়েছেন শুধু কবির প্রতিই নয়, যারা কবির এই কবিতাটিকে সমর্থন করেছিলেন এবং শ্রীজাতবাবুর পাশে দাঁড়িয়েছেন তাঁদের প্রতিও। অনেকেই শ্রীজাতবাবুকে গ্রেপ্তারের দাবিও করেছেন। ভাবখানা এমন যেন তাদের জাত, কূল, মান, ইজ্জত সব এই একটি কবিতার দ্বারা ভূলুন্ঠিত হয়ে গেছে। এবং শ্রীজাতবাবু ও তাঁর গুণমুগ্ধ সমর্থকরা এখন গণশত্রু বা আরো নির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে তাঁরা এখন হিন্দু ধর্মের শ্রেণীশত্রু। স্বভাবতই মিডিয়া, সংবাদপত্র, সোশ্যাল সাইট থেকে শুরু করে ট্রেন, বাসের যাত্রী এমনকী স্থানীয় চায়ের দোকানের আড্ডার কুশীলবরাও এখন দুভাগে বিভক্ত—একদল কবির পাশে, আর একদল কবি ও তাঁর সৃষ্ট এই কবিতাটির বিরুদ্ধে।
বস্তুতঃ দেশের রাজনীতিটা ইদানীং এই ধর্ম ও ধর্মীয় অনুশাসন ভিত্তিক হওয়াতেই এত বিতর্ক। ভারতবর্ষ নানা ধর্মের মানুষের মিলনতীর্থ। তাদের নিজ নিজ আচার-বিচার ও রীতিনীতি বিভিন্ন। কিন্তু বিগত তিন বছর ধরে ধর্মের নামে দেশে যা চলছে তা অসভ্যতা তো বটেই, এককথায় আদিমতা। দেশের কেন্দ্রের ক্ষমতাসীন দল এই ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার বীজ বপন করেছে ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনে জিতে। আর তার পরে থেকেই সারা দেশের মানুষের এই ধর্মীয় আবেগটা যেন কোন মন্ত্রবলে জেগে উঠেছে। সিংহভাগ মানুষই এখন নিজ নিজ ধর্মের ভাবাবেগ প্রকাশ করতে ব্যস্ত। যেন ধর্মীয় ভাবাবেগ না দেখালে,তারা হাস্যাপদ হবে আরেকজনের কাছে। এই মনোবৃত্তি কিন্তু বিগত তিন বছর আগে এই রকম মহামারির আকার ধারণ করেনি। তখনও মানুষের মধ্যে ধর্মবিশ্বাস ছিল। তখনও পূজা–‌অর্চনা, আরতি, বলিপ্রথা ইত্যাদি যেমন ছিল, তেমনি নমাজপাঠ, আজান, কুরবানি এসবও ছিল। কিন্তু তখন এই “লোক দেখানো ধর্মবিশ্বাস” এর ব্যাধিটা এখনকার মহামারির মত ছড়িয়ে পড়েনি। তার ফলে দেশের মানুষের মধ্যে আর যাই হোক একটা সম্প্রীতির বাঁধন ছিল। আর বর্তমানে এই ধর্মীয় উগ্রতা আফিম এর নেশার মত একটা ঘোর শুধু সম্প্রীতি বা বৃহত্তর অর্থে যে সংহতি কে নষ্ট করছে তাই নয়, মুক্ত চিন্তা-চেতনা,যুক্তিবাদের দুয়ার রুদ্ধ করেছে। ভারতীয় সভ্যতা আজ একবিংশ শতকে উত্তীর্ণ হয়েও, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আশীর্বাদে বলীয়ান হয়েও, মহাকাশ গবেষণা সংস্থা তথা I.S.R.O এর এই ঐতিহাসিক কৃতিত্বের সাক্ষী হয়েও আজ ধর্মীয় গোঁড়ামি ও অন্ধত্বের বশবর্তী। আর তাই দেশের মানুষের এই দ্বিধাবিভক্ত মানসিকতা প্রকৃতপক্ষেই উন্মুক্ত চিন্তা-চেতনার সঙ্গে বদ্ধ ধর্মীয় সংস্কারের এক তীব্র সংঘাত।

srijato5
কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কবিতাটিকে ঘিরেও মানুষের এই দ্বিমুখী মনোভাব প্রকৃতপক্ষে এই মুক্ততার ও বদ্ধতার মধ্যেই দ্বন্দ্ব বা সংঘাত। কবিতাটির প্রেক্ষাপট উত্তরপ্রদেশের নবগঠিত সরকারের মুখ্যমন্ত্রীর কয়েক বছর আগে করা একটি ঘৃণ্য মন্তব্য । মন্তব্যটি এতই অশালীন, অসামাজিক এবং সাম্প্রদায়িক প্ররোচনামূলক যে তার পরেও এ হেন একজন মানুষকে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে চয়ন করাই গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষে চরম বিপজ্জনক। মুখ্যমন্ত্রী পদে অভিষিক্ত হওয়ার পরেই শ্রীজাতবাবু প্রতিবাদস্বরূপ “অভিশাপ” নামে কবিতাটি লেখেন এবং পোস্ট করেন। তার বিষয়বস্তু হল বিধর্মে আঘাত হানার বিরুদ্ধে হিন্দু ধর্মের হিংসার প্রতীক-(বা মতান্তরে পবিত্রতার প্রতীক) ত্রিশূলের গর্ব খর্ব করা হয়েছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে যারা শ্রীজাতবাবুর এই কবিতার ঘোর বিরোধী এবং মনে করেন হিন্দু ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হেনেছে এই কবিতা, উত্তরপ্রদেশের নব মুখ্যমন্ত্রীর বিধর্মী মৃতা মহিলাকে কবর খুঁড়ে ধর্ষণ করার নিদান দেওয়ার ব্যাপারে তাঁদের কি প্রতিক্রিয়া ? সেখানেও তো পরধর্মের প্রতি তীব্র বিতৃষ্ণা এবং আদিম হিংসা। আর তার উগ্রতা এতই বেশি যে বিধর্মী মৃতা মহিলাও সেই হিংস্র ধর্মযাজকের রোষানল থেকে রেহাই পায় না। সমাজে বিষ ছড়ায় তো এই উদগ্র মনোভাবাপন্ন ধর্মযাজকরাই। দেশের অখণ্ডতা, সার্বভৌমত্বের পক্ষে যা ভয়ঙ্কর এক আঘাত! সেই ব্যাপারে এই বিরুদ্ধাচরণকারীদের কি প্রতিক্রিয়া? তাদের অধিকাংশই এই মন্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়া দেননি। কেউ মন্তব্যটির সত্যতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন। কেউ আবার স্মৃতিদৌর্বল্যের দোহাই দিয়ে এড়িয়ে গেছেন। কিন্তু ঘটনাটি যে সর্বৈব সত্য, তাতে কোনও সন্দেহই নেই। সুতরাং শ্রীজাতবাবুর প্রতিবাদী, যুক্তিবাদী চিন্তাকে যারা নিতে পারলেন না, উত্তরপ্রদেশের উগ্র ধর্মান্ধ মুখ্যমন্ত্রীর বদ্ধ সংস্কার ও অন্ধত্বকে তারা গ্রহণ করছেন কীভাবে? আমরা কি তবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এই আকাশ্চুম্বী প্রগতির দিনেও এই সামাজিক ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে ক্রমশ পশ্চাৎপদে হাঁটছি ?
আসলে এই মুক্ততা ও বদ্ধতার সংঘাত শুধু বাংলাতেই নয়, সারা ভারতবর্ষেই আছে। বা প্রতিবেশী বাংলাদেশেও প্রায়সই এই প্রতিবাদী, যুক্তিবাদী চেতনার সমূলে কুঠারাঘাত করা হচ্ছে। ভারতেই ২০১৩ সালে পুণেতে নরেন্দ্র দাভোলকারের হত্যা, বা ২০১৫ সালে মহারাষ্ট্রে গোবিন্দ পানসারে হত্যা বা সেই বছরেই কর্ণাটকে এম.এম.কালবুর্গি হত্যা তারই দৃষ্টান্ত। কিছুদিন আগেও মহারাস্ট্রে এই বদ্ধ সংস্কারের বলি হয়েছেন আরও এক প্রগতিশীল লেখক। বাংলাদেশেও অনেক মুক্তমনা, প্রগতিশীল কবি, লেখক মৌলবাদী আক্রমণের শিকার হচ্ছেন ব্লগ লিখে । সুতরাং যেখানেই প্রগতিশীল চিন্তা সেখানেই বদ্ধতার, অন্ধত্বের, গোঁড়ামির হুমকি, আর আক্রমণ—আর প্রতিবাদী কণ্ঠকে চিরতরে স্তব্ধ করে দেওয়ার প্রচেষ্টা। মৌলবাদ ও মনুবাদ এই বদ্ধতারই অন্যতম প্রতীক। বিগত কয়েক বছরে দেশে মনুবাদীদের এত বাড়বাড়ন্তের কারণে মৌলবাদ ও আজ যে যে স্থানে মনুবাদ অপেক্ষাকৃত দুর্বল, সেখানেই দাঁত-নখ বের করে আক্রমণ হানছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ তথা সমাজবিজ্ঞানের লব্ধপ্রতিষ্ঠ যশস্বী অমর্ত্য সেনও প্রায়ই এই দুরাচারীদের কদর্য আক্রমণের শিকার হচ্ছেন। মুক্ত ও বদ্ধের এই বিবাদের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শ্রীজাতবাবুর কবিতা শুধু ধর্মীয় কুসংস্কারের বদ্ধ দ্বারে আঘাতই নয় তা বাস্তবিকই এক জনজাগরণের প্রচেষ্টা। তাই তাকে রুখে দেওয়ার, সেই মহৎ উদ্দেশ্যকে ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা এক চরম অসহিষ্ণুতা ও নিম্ন মনোবৃত্তির পরিচায়ক। আর শ্রীজাতবাবুর বিরুদ্ধাচারীদের এটাও মাথায় রাখা উচিত শ্রীজাতবাবু বাংলাদেশের এই সামাজিক ব্যাধি মৌলবাদের বিরুদ্ধেও বহুবার সোচ্চার হয়েছিলেন তাঁর প্রতিবাদী কবিতার মাধ্যমে। তিনি যে কেবল হিন্দু ধর্মের হিংসা ও গোঁড়ামির প্রতিবাদী তা নয়, তাঁর ক্ষুরধার লেখনী ইসলামি সন্ত্রাসবাদ ও মৌলবাদের বিরুদ্ধেও আগুন জ্বালিয়েছে “অন্ধকার লেখাগুচ্ছ” নামক কবিতা সঙ্কলনে। অনেকে বলছেন, শ্রীজাত পারবেন মুসলিম মৌলবাদের বিরুদ্ধে লিখতে?‌ তাঁরা দয়া করে সেই সময়ের লেখা কবিতাগুলো পড়ে নিন। অবশ্য, বই কিনে এঁরা পড়বেন, এতটা আশা না করাই ভাল। কারণ, পড়ার মানসিকতা থাকলে তো সমস্যাই হত না। তাহলে তো এত কুযুক্তির ফোয়ারা উড়ত না। যুক্তিবাদী কবি ও লেখকদের কাজই হল সংস্কারের জগদ্দল পাষাণকে ভেঙে সমাজকে গোঁড়ামি, অনাচার ও হিংসার রাহুমুক্ত করা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সেই সংস্কারাবদ্ধ বঙ্গীয় সমাজে জ্ঞান ও যুক্তির আলোকবর্তিকা ছিলেন। “বিদ্রোহী কবি” নজরুল ও সেই উন্মুক্ত চেতনার রাজপথের পথিক। বাংলাদেশের হুমায়ুন আজাদ ও ধর্মীয় গোঁড়ামি ও হিংসার বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করেছিলেন তাঁর কলমাস্ত্রের মাধ্যমে। তাই সমকালীন প্রতিবাদী কবি শ্রীজাতবাবুর কণ্ঠরোধের চেষ্টা প্রকৃতপক্ষে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক দেশে ধর্মীয় সংস্কার ও গোঁড়ামির অচলায়তনকেই মান্যতা ও প্রশ্রয় দেওয়া, যা শুধুমাত্র দেশের সার্বিক অগ্রগতির পরিপন্থীই নয়, সমাজ ও সভ্যতার পক্ষে ভয়ঙ্করতার ইঙ্গিতবাহী।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

7 − 2 =

You might also like...

solan3

চোখ ধরেছে মেঘের ছাতা

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk