Loading...
You are here:  Home  >  খেলা  >  Current Article

কোচবদল কোনও সমাধান নয়

By   /  April 18, 2017  /  No Comments

সত্রাজিৎ চ্যাটার্জি

আশঙ্কাটাই শেষপর্যন্ত সত্যি হল। আবারও ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবে কোচ বদল। চলতি আই লিগে শেষ চার ম্যাচে ধারাবাহিক পরাজয়ের এবং খেতাব জয়ের লড়াই থেকে ছিটকে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ কোচ ট্রেভর মর্গানকে ক্লাবের তরফ থেকে বরখাস্ত করা হলো। বা ইদানীং নতুন একটা ফ্যাশন হয়েছে, বিশেষতঃ কলকাতার দুই-প্রধানে কোচকে সরাসরি ছাঁটাই না করে তার ওপর ক্লাবের অন্দরমহল থেকে নানারকম চাপ সৃষ্টি করা হয়। বা তাঁর সাথে আলোচনায় বসে তাঁকে হাবে ভাবে বুঝিয়ে দেওয়া হয় যে দলের পারফরম্যান্সে ক্লাব কর্মকর্তারা একেবারেই খুশি নয় এবং এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার জন্য খোদ টিম ম্যানেজারই শুধুমাত্র দায়ী এবং তিনি ভালোয় ভালোয় এই ব্যর্থতার দায় মাথায় নিয়ে সসম্মানে পদত্যাগ করুন। ইষ্টবেঙ্গলের কোচ মর্গানও পদত্যাগ করলেন বা তাকে করতে বাধ্য করা হল। এই পদ্ধতিতে দুদিকই রক্ষা হয়। নিজেদের ঘনঘন কোচ তাড়ানোর দুর্নাম থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। আর অন্যদিকে কোচ ক্যামেরার সামনে এসে যদি স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করার নিদান দেন, তাহলে তার এজেন্ট এবং ক্লাবের স্পন্সরশিপ সংস্থাকেও বিশাল অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রয়োজন হয় না। তাই নতুন এই প্রথা চালু করেছে ভারত তথা বিশ্বের বিভিন্ন ক্লাবগুলি। আর বিগত ৪-৫ বছরের খতিয়ান দেখলে এটা পরিষ্কার যে ভারতের অন্যতম ঐতিহ্যশালী ক্লাব ইষ্টবেঙ্গলেও এই বদরোগ এখন ভালোরকমই ছড়িয়ে পড়েছে। আগে ইষ্টবেঙ্গল সমর্থক হিসেবে এই ব্যাপারে অন্ততঃ কিছুটা হলেও গর্ব অনুভব করতাম যে, এই ক্লাবে অন্ততঃ ঘন ঘন কোচ বদলের রেওয়াজ নেই। এখানে কোচের ওপর আস্থা, ভরসা রাখা হয়। এই ব্যাপারে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের জুড়ি মেলা ভার ছিল। ইষ্টবেঙ্গলের কাছে হারলেই সেখানে কোচ বদলের হাওয়া উঠে যেত, আর এই নিয়ে মোহনবাগান ক্লাব ও সমর্থকদের বিদ্রুপ করতেও ছাড়তাম না। কিন্তু বিগত ৪-৫ বছরের নিরিখে দেখা যাচ্ছে এই কলঙ্ক প্রিয় ক্লাব ইষ্টবেঙ্গলের গায়েও ভালরকমই লেগে গেছে।

east bengal

আসলে এত অপদার্থ কর্মকর্তা আর জঘন্য ম্যানেজমেন্ট থাকলে এই ক্লাবে পৃথিবীর কোনও কোচ এসেই বিশেষ কিছু করতে পারবেন বলে মনে হয় না। বরং কিছুমাস পরেই টিমের পারফরম্যান্স খারাপ হলে ক্রমাগত সমর্থকদের গালাগালি ও বিক্ষোভের মুখে পড়ে তাঁকে পদত্যাগ করতেই হবে। যে ক্লাবে সুদীর্ঘ সময় কর্মকর্তাদের কোনও নির্বাচন হয় না, ক্লাবের যাবতীয় ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছেন মুষ্টিমেয় কিছু ক্ষ্মতালোভী ও স্বার্থান্বেষী ব্যক্তি, ফুটবল ম্যাচে সেই দলের বা ক্লাবের এরকম বিপর্যয় মোটেই অস্বাভাবিক নয়। তার ওপর রয়েছে কিছু ফুটবলারদের শৃঙ্খলা না মানা, নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করা, কিছু কর্মকর্তার মদতে কোচের ওপর বিদ্রোহী হওয়া এবং কোচের বিরুদ্ধে সতীর্থদের ক্রমাগত ক্ষেপিয়ে তোলা। কোচের কাজ টিম ম্যানেজ করা। তিনি তো আর মাঠে নেমে খেলবেন না। তার কাজ টিমটাকে ঠিকঠাক গাইড করা। মেনে নিচ্ছি, মর্গান সাহেবের ইষ্টবেঙ্গলের কোচ হিসেবে বিগত টার্মের ৩ বছরের সাথে এই টার্মের ১ বছরের অনেক, অনেক পার্থক্য। সেবার ৩ বছরে তিনি দলটাকে একটা জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। আই লিগ না জিতলেও দু-দুবার রানার্স হয়েছিল ইষ্টবেঙ্গল। সেই ৩ বছরে ৮ টা ট্রফি জিতেছিল লাল হলুদ শিবির। যার প্রাপ্তিস্বরূপ কলকাতা লিগের শেষ ম্যাচে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব মোহনবাগানকে ৩-২ গোলে পরাজিত করে লিগ জ়য়ের পরে তাঁকে নিয়ে সমর্থকদের বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস আর আবেগের সামিল হয়েছিলাম আমি নিজেও। সর্বোপরি লীগ জয়ের সেই বাঁধনহীন উচ্ছ্বাসের রেশ কাটতে না কাটতেই সাংবাদিক সম্মেলনে এসে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত সাহেব কোচের আচমকা পদত্যাগের সিদ্ধান্তে বিস্ময়াহত ও বাকরুদ্ধ হয়েছিল ইষ্টবেঙ্গলের অগণিত সমর্থক। আর তার পরে মর্গানের দেশে ফেরার দিন অবধি তাঁর ফ্ল্যাটের বাইরে বা ক্লাব তাঁবুতে এসে মর্গানের পদত্যাগের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার করার বা সেই কঠিন সিদ্ধান্ত ভেঙে ফিরে আসার অনুরোধে সামিল হয়েছিল কয়েকশো সমর্থক। অনেককে মর্গানের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েও অনুরোধ করতে দেখা গিয়েছিল। ভারতীয় ফুটবলে কোনও বিদেশি কোচকে ঘিরে এইরকম শ্রদ্ধা, সম্মান, ভালোবাসা আর আবেগের স্ফূরণ আর কবে দেখা গিয়েছে কেউ মনে করতে পারবেন ?
আর এবার? আই লিগের প্রথম দিকের ৩-৪ টি ম্যাচের পর থেকেই কোচের কিছু একগুঁয়ে এবং কিছু হঠকারী সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমর্থককের মনে ক্ষোভ পুঞ্জীভূত হচ্ছিল। তিনি দিনের পর দিন উইং প্লে তে প্র্যাকটিস করান না। ভারতসেরা মিডফিল্ডার রোমিওকে, উইঙ্গার জ্যাকিচাঁদ সিংকে, ফরোয়ার্ড হাওকিপকে তিনি দিনের পর দিন রিজার্ভ বেঞ্চে বসিয়ে রাখেন। তার ফলস্বরূপ টিম কোনওমতে উতরে গিয়েছে খুব বাজে খেলেও। যেহেতু তখন লিগ টেবিলে ইষ্টবেঙ্গল প্রথম তিনের মধ্যে ছিল, তাই ক্ষোভের আগুনটা ছিল ছাই চাপা। তাতে ঘি ঢালা হল শেষ চারটি ম্যাচে ধারাবাহিক পরাজয়ের পরে। তার মধ্যে একটি আবার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী মোহনবাগানের বিরুদ্ধে। এমনিতেই ১৩ বছর আই লিগ না পেয়ে সমর্থকরা বিষাদগ্রস্ত, তার ওপর দু বছর আগে পড়শি ক্লাব মোহনবাগানের তাঁবুতে আই লিগ আসার পর থেকে ইষ্টবেঙ্গল সমর্থকরা একদিকে যেমন ভারাক্রান্ত, তেমনই আই লিগ জয়ের স্বাদ পেতে মরিয়া। তাই টানা চার ম্যাচের পরাজয় ও খেতাবি লড়াই থেকে ছিটকে যাওয়া মেনে নেওয়া কখনই সম্ভব নয়, যেখানে ফার্স্ট লিগের শেষে প্রিয় দল শীর্ষ স্থানে ছিল। অতএব ক্লাব তাঁবুতে গিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন, কোচ তাড়ানো হোক, ইত্যাদি গত ৩-৪ দিনের প্রায় সব সংবাদপত্রের খেলার পাতার শিরোনামে স্থান পেল। আর তার জেরে গতকাল আচমকাই কোচের বিদায়।
কিন্তু সত্যিই কি কোচ বদল আদৌ এই টিমের পারফরম্যান্স রাতারাতি পাল্টে দিতে পারবে? নতুন যিনি কোচ হয়ে আসবেন, তাঁকেও তো মানিয়ে নিতে এবং দলের ফুটবলারদের সঙ্গে একাত্ম হতে কিছুটা সময় নিতেই হবে। ইষ্টবেঙ্গল দলের এই ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় কি শুধু বিদায়ী কোচ ট্রেভর মর্গানের? আচ্ছা,কর্মকর্তারা কেন সকাল-বিকেল প্র্যাকটিসের সময় মা্ঠে গিয়ে খেলোয়াড়দের উজ্জীবিত করেন না? কেন তাঁরা সিনিয়র প্লেয়ারদের সঙ্গে কোনও গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে আলাদা করে কথা বলেন না? কেন তাঁরা জুনিয়রদের মোটিভেট করেন না ? কেন একজন ফিজিওকে নিয়োগ করেও হঠাৎ করে একদিন সেই ফিজিও ক্লাবকে কিছু না জানিয়েই দেশে ফিরে গেলেন? ক্লাবের কি কোনও পেশাদারিত্ব নেই ? সবাই জানেন, আই লিগ একটি ম্যারাথন রেস। এখানে অনেক ম্যাচ খেলতে হয়, বিভিন্ন উচ্চতায় এবং আবহাওয়াতে। তাই আই লিগে সাফল্য পেতে গেলে একজন উন্নতমানের ফিজিওর ভূমিকা অনস্বীকার্য। যেখানে পড়শি ক্লাব গার্সিয়ার মত একজন সুদক্ষ ফিজিওকে নিয়োগ করে তার সুফল পেয়েছে বা পাচ্ছে, সেখানে ইষ্টবেঙ্গলে কেন কোনও ফিজিও নেই? বেঙ্গালুরু এফ.সি–‌র বিরুদ্ধে অ্যাওয়ে ম্যাচে ৫৭ মিনিটে দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ওয়েডসন চোট পেয়ে তিন ম্যাচ যখন দলের বাইরে চলে গেল, তখনই স্পষ্ট হয়ে গেল ম্যারাথন লিগে চ্যাম্পিয়নশিপে লড়াই করা একটা দলের ফিজিও না থাকার কুফলটা। তাছাড়া কেন ক্লাবের প্রাক্তনীদের ক্লাবে ডাকা হয় না? কেন তাঁদের সুদীর্ঘ খেলোয়াড় জীবনের সমৃদ্ধ অভিজ্ঞতা বর্তমান খেলোয়াড়দের জানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয় না? কেন টেকনিক্যাল কমিটি নেই? নিয়মশৃঙ্খলা এত ঠুনকো কেন? ইষ্টবেঙ্গল-মোহনবাগান ক্লাব সাপোর্টারদের ক্লাব। জনগণের ক্লাব। পারফরম্যান্স খারাপ হলে সমর্থকরা সেখানে বিক্ষোভ দেখাবেন—এটাই স্বাভাবিক। সব ফুটবলার, কোচ ও কর্মকর্তাদের সেই বিক্ষোভের আগুনে পুড়তেই হয়। এটাই ময়দানের ইতিহাস। এটাই ময়দানের নিয়ম। কী করে সেখানে দলের নির্ভরযোগ্য এক গোলকিপার সমর্থকদের বিক্ষোভ দেখে অশালীন ইঙ্গিত করতে পারেন ? তিনি কি জানেন না ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবের অতীর গৌরব গাথা ও ঐতিহ্যের কথা? না জানলে, ভিনরাজ্যের সেই গোলকিপারকে সেই ব্যাপারে জানানোর ও শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব ক্লাব কর্মকর্তাদেরই। সেই কাজ কি তাঁরা আদৌ করেছিলেন কখনও? মোহনবাগান ম্যাচের আগে ফুটবলারদের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলে তাদের উজ্জীবিত করাই ক্লাব অফিসিয়ালদের একমাত্র কর্তব্য? সেই কাজ কি আদৌ হয় ইদানীং? চতুর্থ বিদেশি নির্বাচনে এত দীর্ঘসূত্রিতা কেন ? বিগত ৪-৫ বছরে চতুর্থ বিদেশি নিয়ে গড়িমসির কারণে বারবার ক্লাবকে খেসারত দিতে হয়েছে। সেই ভুল থেকেও কোনও শিক্ষা নেওয়া হয়েছে ? অনেকে দেখলাম চেন্নাই ম্যাচে পরাজয়ের পরে যখন ৪ সপ্তাহ আই লিগের কোনও খেলা ছিল না, তখন কোচ কেন সেই অবস্থায় খেলোয়াড়দের আরও কঠোর অনুশীলন না করিয়ে, বিগত ম্যাচগুলোর ভুলত্রুটি না শুধরে দিয়ে দেশে ফিরে গেলেন ছুটি কাটাতে, সেই প্রশ্ন তুলছেন—এ ক্ষেত্রে কোচের যদি দায়বদ্ধতার অভাব থাকে, তাহলে কর্মকর্তাদের অপদার্থতা এখানে আরও অনেক, অনেক বেশি। তাঁরা কি পারতেন না কোচকে সেই এক মাসে কিছু অতিরিক্ত মূল্য দিয়ে রেখে দিতে ? যেখানে একমাস ছুটির পরের ম্যাচটাই ছিল মোহনবাগানের সঙ্গে? একমাসের অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার মতো সংস্থান নেই ইষ্টবেঙ্গল ক্লাবের? এটা বিশ্বাসযোগ্য? ক্লাবের জনৈক “সর্বজ্ঞ” কর্তা নিউজ চ্যানেলের সামনে নিজেকে “ I am the best” দাবি করেছিলেন ? এই কি তার নমুনা ? আর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ক্লাব এই সময়টাতে খুব ভালোভাবেই অনুশীলন করে, নিজেদের পূর্ববর্তী ম্যাচের ভুলগুলো শুধরে নিয়েছিল। আর তার সুফলও পেয়েছিল ৯ এপ্রিল শিলিগুড়িতে ইষ্টবেঙ্গলকে হারিয়ে। সুতরাং আমি মনে করি কোচ বদলটা কখনই ক্লাব ও খেলোয়াড়দের পক্ষে ভাল ইঙ্গিত নয়। আর রাতারাতি টিমের পারফরম্যান্স বদলে দেওয়ার পক্ষেও নয়। ঘনঘন কোচ বদলে ক্লাব প্রশাসনের অপদার্থতাই বারবার স্পষ্ট হয়ে ওঠে। কোচ বদল না করে, ক্লাবের আভ্যন্তরীণ বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনা চিন্তা করা দরকার। ফুটবলারদের মধ্যে জেতার, চ্যাম্পিয়ন হওয়ার খিদেটা জাগানো দরকার। তাদের দায়িত্ববোধ জাগানো দরকার। প্রয়োজনে গোটা ক্লাবের খোলনলচে পাল্টানো হোক। তবেই সাফল্য আসবে। নয়তো প্রতিবারেই আই লিগ শেষে ক্লাবে কোচ বদল আর অগণিত সদস্য-সমর্থকদের একরাশ হতাশা, যন্ত্রণাই প্রাপ্তি হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

8 − 3 =

You might also like...

national flag

একটি তারিখের আড়ালে

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk