Loading...
You are here:  Home  >  ওপেন ফোরাম  >  Current Article

গৌরী লঙ্কেশ নয়, আক্রমণটা মুক্তচিন্তার বিরুদ্ধেই

By   /  September 10, 2017  /  No Comments

সত্রাজিৎ চ্যাটার্জি

সেই কত যুগ আগে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “শিক্ষা আনে চেতনা”। আরও লিখেছিলেন “আমার আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ,. চুনি উঠল রাঙা হয়ে। সেই “চেতনা” র বিভিন্ন রূপের বহিঃপ্রকাশ ঘটে বরেণ্য মানুষের কর্ম, সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে। রবি ঠাকুর, নজরুল, স্বামী বিবেকানন্দ যেমন আমাদের দেশেরই এক একটি “চেতনার” নাম, তেমনি যুক্তিবাদী, মুক্তমনা মানুষও তাঁর নিজ নিজ চেতনার স্বাতন্ত্র্যে সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠেন। গৌরী লঙ্কেশ্বরও সেই “চেতনার” ই একটি নাম।

দেশে এখন সামাজিক যা অবস্থা তাতে গৌরী লঙ্কেশ্বর এর মতো যুক্তিবাদী, ‘‌মুক্তচিন্তার আধার” দের জীবন সংশয় বা বলি যে হবেই, এ আর নতুন কথা কী ? বর্তমানে সারা দেশটা এক স্বৈরাচার, উগ্র ধর্মান্ধতার বাতাবরণে চালিত হচ্ছে। এখানে ধর্মটাই হয়ে উঠেছে দেশবাসীর সবচেয়ে বড় পরিচয়। আর এই অনাচারের বিরুদ্ধাচরণ করলেই একশ্রেণীর সাম্প্রদায়িক, ধর্মের ধ্বজাধারীরা তাঁকে “দেশদ্রোহী” আখ্যা দিয়ে তাকে নানাভাবে হেনস্থার চেষ্টা করছে। সবচেয়ে লজ্জার হল, দেশ তথা সমাজের লব্ধপ্রতিষ্ঠ ব্যক্তিত্বরাই এই আগ্রাসনকারীদের প্রধান লক্ষ্য। কারণ এরা নিজ নিজ স্বতন্ত্র চেতনায় বলীয়ান। পৃথিবীর অতীত ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় সেই সুদূর অতীতেও বিজ্ঞান চেতনায় সমৃদ্ধ মানুষদের ওপর কুসংস্কারাচ্ছন্ন এক শ্রেণীর বিকৃত রুচির মানুষদের আঘাত নেমে এসেছিল। মহাবিজ্ঞানী গ্যালিলিওর কথাই ধরা যাক। তিনি তাঁর বিজ্ঞানসাধনার লব্ধ জ্ঞানের সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে পৃথিবীই সূর্যের চারিদিকে প্রদক্ষিণ করে। সূর্য স্থির, পৃথিবীই ঘূর্ণায়মান। সারা বিশ্বকে তিনি এই “মহাসত্য” শিখিয়েছেন। অথচ তার পরিণাম কী হয়েছিল ? ইতালির তদানীন্তন সম্রাটের হুকুমে গ্যালিলিওকে মানুষের বদ্ধ সংস্কারে দ্বার ভেঙে সত্য উদ্ঘাটনের পুরস্কার স্বরূপ জীবনের শেষ সময় কাটাতে হয়েছিল কারাগারের অন্ধকারে। কারণ মানুষের বদ্ধসংস্কার ছিল সূর্য ঘোরে আর পৃথিবী স্থির। সুতরাং মানুষের মনে হয়েছিল গ্যালিলিও তাদের সেই সংস্কারে আঘাত দিয়েছেন। পৃথিবীবিখ্যাত দার্শনিক সক্রেটিসের কথাই যদি বলি। তাঁকেও “হেমলক” বিষ পান করে জীবন দিয়ে প্রমাণ করতে হয়েছিল যে তাঁর দর্শনশাস্ত্রীয় চেতনা নির্ভুল ছিল। তাঁর পরও সারা পৃথিবীতে এরকম কুসংস্কারাচ্ছন্ন মনোভাবের বলি হয়েছেন বহু বরেণ্য মানুষ। বাংলায় বিদ্রোহী কবি কাজি নজরুলকেও একশ্রেণীর মৌলবাদীরা নানভাবে আক্রমণ করেছিল। আর সেই ধারার এখনও অবধি সর্বশেষ শিকার গৌরী লঙ্কেশরের মত সমাজচেতনায় ঋদ্ধ একজন সাংবাদিক ।

gouri lankesh

বিগত চার বছরেই এই উগ্র সংস্কারাচ্ছন্নতার বলি হয়েছেন আরও বহু বিশিষ্ট মানুষ। ২০১৩ সালে মহারাষ্ট্রে নরেন্দ্র দাভোলকরের হত্যা বা ২০১৫ সালে সেই মহারাষ্ট্রেই গোবিন্দ পানসারের মতো প্রগতিশীল, যুক্তিবাদী মানুষ একশ্রেণীর উগ্র, ধর্মান্ধ, মৌলবাদীর হাতে খুন হয়েছিলেন। ২০১৫ সালেই কর্ণাটকে এম.এম.কালবুর্গীর মত স্বনামধন্য লেখক এবং সমাজকর্মীকেও প্রাণ দিতে হয়েছিল এই হিংস্র, বর্বরদের হাতে। বাংলাদেশেও মৌলবাদের শিকার হয়েছেন অভিজিৎ রায়ের মতো মুক্তমনা, প্রগতিশীল লেখক। কিছুমাস আগে মৌলবাদের বিরুদ্ধে লিখে এইসময়ের জনপ্রিয় কবি শ্রীজাত বন্দ্যোপাধ্যায়ও এই ধর্ম-ব্যবসায়ীদের রোষানলে পড়েছিলেন। অমর্ত্য সেনের মতো নোবেলজয়ী যশস্বী, বিশ্ববরেণ্য অর্থনীতিবিদও এই ঘৃণ্য মানসিকতার শিকার হয়েছেন বারংবার।

গৌরী লঙ্কেশরও সেই যুক্তিবাদী, সেই মুক্তমনা মানুষদেরই প্রতিভু যিনি সারা জীবন আপোষহীন সংগ্রাম করেছিলেন দেশ তথা সমাজ ও সভ্যতার সর্বাপেক্ষা বড় শত্রু এই তথাকথিত “হিন্দুত্ববাদী” দের বিরুদ্ধে। স্বভাবতই তাঁকে হুমকি দেওয়া হয়েছিল একাধিকবার। তাতেও তিনি দমে যাননি বা বিকিয়ে যাননি। আর তার পরিণাম স্বরূপ তাঁকেও চলে যেতে হল সেই হিংস্র, বর্বর, উগ্র ধর্মান্ধ একশ্রেণীর নরপশুদের হাতে, যারা স্বৈরাচারী শাসকের প্রচ্ছন্ন মদতে একটা গণতান্ত্রিক দেশের সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতিকে ধর্মের নামে তিলে তিলে শেষ করছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, এই হিংস্রতা, এই আগ্রাসনের শেষ কোথায়? আজ মানব সভ্যতা একবিংশ শতকে পদার্পণ করেছে। বিজ্ঞান চেতনা আজ গ্রহ ছাড়িয়ে তার ডানা মেলেছে সুদূর মঙ্গলে। চিকিৎসাবিজ্ঞান আজ খ্যাতির শিখরে উন্নীত হয়েছে। বৈদ্যুতিন পরিষেবা তথা ইন্টারনেটের কল্যাণে আজ সারা পৃথিবীর সংবাদ এক লহমায় মানুষের হাতের মুঠোয়। সভ্যতার এই বিবর্তনের যুগেও কেন এই অন্ধবিশ্বাস? কেন এই উগ্রতা? কেন এই গোঁড়ামি ? আজও কেন ধর্ম নিয়ে বিভাজন, উচ্চ-নীচ, জাত-পাতের বিভেদ ? আজও কেন মন্দিরে-মসজিদে পাথরের জড়মূর্তির মাথায় বিভিন্ন সময়ে দুধ ঢেলে পুণ্যলাভের আশা করা হয় আর সেই ধর্মস্থান চত্বরে শত শত অনাহারী, শীর্ণকায়া, বুভুক্ষু শিশুদের মুখে সেই দুধ ঢালার জন্য কেউ এগিয়ে আসে না। এর কারণ একটাই। সেই বদ্ধতা, সেই কুসংস্কার, সেই অশিক্ষা। আর এসব “বদ্ধতা”র বিরুদ্ধে যারা সমাজকে যুগে যুগে মুক্তির পথ দেখাচ্ছেন সেই, “আলোক–‌দিশারী” দের ওপরের নেমে আসছে আঘাত আর আক্রমণ”। দাভোলকর, পানসারে, কালবুর্গী, গৌরী—এঁরা আলাদা আলাদা ব্যক্তি হলেও বস্তুতঃ এঁরা সবাই একই পথের পথিক। এঁরা এক একটি “চেতনা”র নাম। আবারও সেই “চেতনার”ই অপমৃত্যু ঘটল “চেতনাহীন”দের হাতে। এ লজ্জা মানবসভ্যতার। এ লজ্জা মনুষ্যত্বের।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

twelve + 11 =

You might also like...

taxi

হাওড়া স্টেশন নিয়ে প্রশাসনের হেলদোল নেই

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk