Loading...
You are here:  Home  >  কলকাতা  >  Current Article

এক মুঠো রোদ আর প্রজাপতি বিস্কুট

By   /  October 14, 2017  /  No Comments

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

যদিও আজ যখন লিখছি তুমুল বৃষ্টি, তবু এই ছবি মেঘলা গুমোট আবহাওয়ায় এক মুঠো ভালবাসার রোদের গল্প বলে। অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের প্রথম ছবি “ওপেন টি বায়োস্কোপ” কিংবা শিবপ্রসাদ–‌নন্দিতার ফ্যামিলি মুভি দেখবার মন নিয়ে যদি “প্রজাপতি বিস্কুট” দেখতে যান এই ছবি তাদের ভালো লাগবেনা। অনিন্দ্যর এই ছবি যুগের থেকে অনেক এগিয়ে অনেক উন্নত। ছবিটা কারো খুব ভাল লাগবে, কারো মাঝারি লাগবে কাউকে বোর করবে খারাপ লাগবে। এক এক জনের এক এক রকম অনুভূতি হবে। কিন্তু ছবিটার প্রজাপতির ডানা ঝাপটানো মনে রয়ে যাবে। এই ছবি পরিবারকেন্দ্রিক হলেও আদতে পারিবারিক ছবি নয়। যা ভেবেই বেশি দর্শক বাচ্চাকাচ্চা সারা পরিবার মিলে গেছে আর নোংরা ছবি বলছে। কার মনন কেমন তার উপর নির্ভর করছে ছবির ভাল লাগা মন্দ লাগা। ঋতুপর্ন ঘোষ “চোখের বালি”,”অন্তরমহল” করে বাংলা ছবিতে সাহস জুগিয়েছিলেন বলেই অনিন্দ্য সেই সাহসটা দেখাতে পেরেছেন। একটা বিশাল সামাজিক চাপ যা বিয়ের পর নতুন দম্পতিদের তৈরি হয় সেইটাই প্রধান বিষয় এই ছবির। এ তো আর পাঁচটা কাপলের গল্প কিন্তু তাদের মানসিক অবস্থা কজন পরিবারের লোক সমাজের লোক ভেবে দেখেন?

prajapati2
একটা বিয়ে টিকিয়ে রাখতে গেলে যৌন মিলন করে বাচ্চা তৈরি আসল জাদুকরী চাবিকাঠি নয় সেটাই প্রজাপতি বিস্কুট দেখিয়েছে। বিয়ের বছর ঘুরতে না ঘুরতেই সারা পরিবার সমাজ ঝাপিয়ে পড়ে দম্পতির উপর। কবে তারা নাতি নাতনি আনবে। বিশেষজ্ঞ যেন সবাই, তাই কোনও প্রাইভেসি না রেখে অন্যের যৌন জীবন নিয়ে বৈঠকখানায় বাড়ির বড়রা আলোচনা সভায় বসে যায়। দায় যেন তাদের।
বাচ্চা পয়দা করতে পাড়া প্রতিবেশী উঠে পড়ে লাগে। দম্পতির যৌনতা পথে ঘাটে নেমে চায়ের দোকানের আড্ডায় নেমে আসে। বাড়ির সামনে ফেলা হয় কার্তিক ঠাকুর। সারা ছবি জুড়েই বেশ সুন্দর করে বাচ্চা হবার সব উপকরণ সামাজিক মশলা গুলো অনিন্দ্য দেখিয়েছেন। একজন প্রতীকি চরিত্রে সারা ছবি জুড়ে সাহেব সেজে ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর তাঁর ফোনে রিং টোন বাজছে একটা বাচ্চা খিলখিলিয়ে হাসছে অথচ সে ফোনটা কোন পকেটে রেখেছেন খুঁজে পাচ্ছেন না। বেশ লাগল। ছবির নায়িকা শাওন যেমন মা হবার সোনার কাঠি রুপোর কাঠি খুঁজে পাচ্ছে না।
কখনও তৃতীয় লিঙ্গের মানুষদের, কখনও কার্তিক পুজো রাবিন্দ্রিক পরিবারে, কখনও ষষ্ঠীর উপোস রাখা, কখনও বা ‘ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট’।কিন্তু কোনও ‘ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট’ যেমন বাচ্চা করিয়ে দিতে পারেন না, তেমনি কোনও কার্তিক ঠাকুর অলৌকিকতায় মার কোল আলো করে ছেলে দিতে পারেন না। ছবির শেষেও কোনও সমাধান নেই, কারণ এই বিষয়ের কোনও সমাধান হয় না। কিন্তু এই বাচ্চা হচ্ছে না বলে পরিবারের সমাজের নিন্দেতে স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কটা যে ভেঙে যায় না সেটাই খুব সুন্দর নতুন আঙ্গিকে দেখানো হয়েছে এই ছবিতে। একটা বাচ্চা উৎপাদন না করেও বিয়ে টিকিয়ে রাখা যায়, ভালোবাসা মরে না।
এবার আসি ছবির গুনাগুনে,
ভালো গুন
অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায় দুটো দারুণ প্রজাপতি উপহার দিয়েছেন বাংলা ছবির দর্শককে। যারা প্রসেনজিৎ দেব যিশু মহাতারকাদের সঙ্গে বরং বেশি দর্শক হলে আনতে সক্ষম হচ্ছে। আরেকটা অবশ্যই অনিন্দ্যর সেন্স অফ হিউমার, কমেডি স্ক্রিপ্ট এই ছবির মূল চাবিকাঠি।আদিত্য সেনগুপ্ত, দেবাংশু সেনগুপ্ত আর খেয়ালী দস্তিদারের ছেলে হওয়ায় অভিনয়ে নবাগত হলেও খুব দক্ষ। মাতৃমুখী ছেলে অবিকল খেয়ালী দস্তিদারের মতো মুখ। যখন দাড়ি কেটে স্ক্রিনে আসে সেটা আরও ভালো করে বোঝা যায়। আর ওর মুখটা কি নিস্পাপ সরল সেখানে একটা ভালোমানুষ ব্যাপার দেখা যায়। সেটা অরিন্দম গাঙ্গুলির র সান্নিধ্য। খুব সুন্দর শান্ত মিষ্টি অভিনয়। খুব ম্যাচিওর সুক্ষ অভিনয়।
ইশা সাহা। একজন দারুন নায়িকা অভিনেত্রী পেল টলিউড। যার মুখাবয়বে সুচিত্রা সেন ,পাওলি দাম দের সঙ্গে মিল শুধু নয় অভিনয়টাও চরম ভালো জানে। আরও অনেক ছবিতে চাই। ভালো অভিনেত্রী “ঝাঁঝ লবঙ্গ ফুল” দেখেই বোঝা গেছিল। দুরন্ত দেখতে লেগেছে স্ক্রীনে।বহুযুগ পর দীনেন কাজল গুপ্ত তনয়া সোনালী গুপ্ত বসুকে রূপোলী পর্দায় ফিরিয়ে আনার জন্য অনিন্দ্যদাকে অনেক ধন্যযুক্ত। সোনালী গুপ্ত কবছর আগে “সজারুর কাঁটা”য় অভিনয় করলেও সেইরকম প্রচার পায়নি। “প্রজাপতি বিস্কুট” আমি আরও দেখতে যাই হলে সোনালী গুপ্ত কে বড় পর্দায় দেখব বলে। কারণ উনি যখন নায়িকা সানাই, হারমোনিয়াম, প্রথম প্রতিশ্রুতি, প্রিয়তমা ছবিগুলিতে তখন আমি জন্মাইনি। টিভিতেই ওনার ছবি দেখেছি। আজ এত বছর পর বড় পর্দায় তাঁকে দেখে ভালো লাগল। যদিও উনি বাস্তবে যেমন প্রাণচঞ্চল, এই ছবিতে তেমন নন। খুব রাশভারী রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী শিক্ষিকা তেমনি সফিসটিকেটেড শাশুড়ি। খুব ভালো লাগল সোনালীকে রূপালী পর্দায়।
প্রসেন–‌শান্তনু মৈত্র–‌ চন্দ্রাণী–‌ অনুপম প্রজাপতির ডানায় সুরেলা রঙ দিয়েছেন অনবদ্য। অর্ঘ্যকমল মিত্রের সিনেমাটোগ্রাফি দারুণ। ‘ফার্টিলিটি স্পেশালিস্ট’ র চরিত্রাভিনয়ে অর্ঘ্যকমল মিত্র খুব সাহসী।ছবির গানগুলো বেশ মিষ্টি “আহা রে মন বাহারে মন” অনুপমের। “তোমাকে বুঝিনা প্রিয়” চন্দ্রানীকে নতুন ভাবে ফিরে পাওয়া। রত্নাবলী রায় ছোট্ট ক্যামিও চরিত্রে দারুণ।
অপরাজিতা শান্তিলাল এই ছবির আরও দুটো তুরুপের তাস। রজত গাঙ্গুলি ,রজতাভ দত্তর অভিনয় সুন্দর। ছোট বাচ্চা মেয়ে চুরমুর মিষ্টি। খেয়া চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় কী সাবলীল, অনেক দূর যাবেন। দীতিপ্রিয়া রায় রাসমণী করে বিখ্যাত হয়ে ঘরে ঘরে সবার চেনা মুখ। এই ছবিতে নায়িকার বোনের চরিত্রে বেশ পরিণত।আশা ভোঁসলের রবি গান প্রতিটা পাড়ার পুজো প্যান্ডেল মাতালেও তাকে যে মাচার গান বানিয়ে রেখেছেন গোঁড়া রাবিন্দ্রিকরা সেটা ভালো দেখিয়েছে ছবিতে। আশাজি অনেক ট্যালেন্টেড তারা যদি বুঝত।
খারাপ গুন
ছবিতে যৌনতাকে আঁকড়ে বেশি যৌনখিল্লি করা হয়েছে। যেগুলো তাৎক্ষনিক ভালো লাগলেও অনেকদিন পর ছবিটার মান একটু হলেও খাটো করবে। বয়স্ক দর্শক প্রচুর গেছেন তারা নিতে পারেনি। একটা ছবি সব দর্শক ভেবেই করা, কিন্তু প্রথমার্ধ্ব জুড়ে যৌন রসিকতা প্রতি ডায়লগে অযথা বেশি। মীরাক্কেল করছেন মনে হচ্ছিল রজতাভকে।
হাওড়ার লোকেরা কি ওতটাই স্ স্ করে কথা বলেন? শ্যামবাজারের লোকরা বলে বরং। বললেও অপরাজিতা এত বেশি স্ স্ করেছেন যে তাঁর অভিনয় অনেক জায়গায় লাউড আর্টিফিসিয়াল হয়ে গেছে।

prajapati3
কার্তিক ঠাকুর পুজোর পরে জলে গঙ্গায় বিসর্জন হয় না দিতে নেই দিলে পাপ হয় বাচ্চা হয় না তাই পাড়ে বসিয়ে রাখতে হয়, এটা সত্যি? যা দেখানো হল ছবিতে। গঙ্গার ঘাটে বেশি তো শীতলা বসানো দেখি। সঠিক তথ্য কোনটা? এই নিয়মটা আমি জানি না। তাই খারাপ হিসেবে ধরা উচিত নয়।ছবিটা খুবই সাহসী প্রচেষ্টা। কিন্তু আরও একটু ভালো বুনোটের চিত্রনাট্য দরকার ছিল। সব শেষে যে সুন্দর মেসেজ দিয়েছেন পরিচালক বিয়ের প্রধান মাপকাঠি টিকিয়ে রাখার জিনিস যে বাচ্চা নয় সেটা প্রশংসনীয়।
অনেকেই বলেছেন বউ চুল কেটে ফেললেই, বিয়ার খেলেই সব সমস্যা সমাধান হয়ে যায়? কি, উদ্ভট কনসেপ্ট। না সমাধান হয়তো হয় না কিন্তু একটা মানসিক উত্তোরন বিভিন্ন পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে হতে পারে। আমার দেখা এক ভদ্রমহিলা স্বামী মারা যাবার পর থান পরে ঘোরেননি। তিনি সবার আগে পার্লারে গিয়ে চুল বয়েস কাট করে আসেন। শাড়ির সঙ্গে ওয়েস্টার্ন পোশাকও পরতেন। সমাজ যেটা ভালো চোখে নেয়নি। কিন্তু তাঁর মানসিক উত্তরণ সেলফ কনফিডেন্স বাড়ে। প্রজাপতিতেও হাওড়ার মেয়ে শ্রাবণী যে কলেজ–‌জীবনে বিয়ার সিগারেট খেত, জিন্স পরত,আশাজির গান গাইতো, নাচত তাকে বিয়ের পর রাবিন্দ্রিক হয়ে যেতে হয় পুজোপাঠ তুলে দিতে হয় তাঁতের শাড়ীতে সেনবাটির ভালো বউ সেজে সে হয়ে ওঠে শ্রাবণী থেকে শাওন। সুন্দর শ্বশুরবাড়ি হলেও মা হতে না পারার যন্ত্রণা সারা সমাজ যেন তাকে টিটকিরি দুঃখ দিতে থাকে। কিন্তু তার তো আগের জীবনটাই পছন্দ ছিল যেটা সে আসলে। তাই ছবির শেষে উত্তরণ।অন্তর ও তার স্মার্ট কর্পোরেট দাদার মতো নয়। সে খুব সাধারণ, সে যে কোনও ব্যাপারেই হ্যাঁ কি না সেই ডিসিশন নিতে পারে না। কিন্তু সে তার নিজের মতো করে সুখী।ছবির মাঝেমধ্যে চুম্বনরত অবস্থায় ভূমিকম্প হওয়া দেখানো বেশ মজার। যা দিয়েও ছবি শেষ। শেষটা তো যথাযথ। আর কিছু স্লো সিনে ওই ডায়লগ গুলো দরকার ছিল।আজকালকার বাংলা ছবিতে বাঙালিয়ানার খুব অভাব তাই অনিন্দ্য চ্যাটার্জির এই সৎ প্রচেষ্টাকে এবং তাঁর যোগ্য সঙ্গত দেবার জন্য নন্দিতা রায়–‌শিবপ্রসাদ মুখার্জিদের উইন্ডোজ প্রোডাকশন হাউসকে অনেক ধন্যবাদ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

eighteen − 15 =

You might also like...

taxi

হাওড়া স্টেশন নিয়ে প্রশাসনের হেলদোল নেই

Read More →
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk