Loading...
You are here:  Home  >  জেলার বার্তা  >  দক্ষিন বঙ্গ  >  Current Article

মানভূমের জনজাতির নৃতাত্ত্বিক ও ভাষিক সংক্ষিপ্ত পরিচয়

By   /  September 15, 2018  /  No Comments

অসিত বরণ মাহাত

 

পুরুলিয়া জেলার পূর্বনাম ছিল ‘মানভূম’। কিন্তু এই নামের উৎপত্তি নিয়েও বিভিন্ন মহলে মতপার্থক্য আছে। অনেকের অনুমান ‘মান’ একটি রাজবংশের নাম। অতীতে অনার্য এই রাজবংশটি মানভূম, সিংভূম ও তদসংলগ্ন উড়িষ্যা অঞ্চলে রাজত্ব করত। বর্তমানেও পুরুলিয়া জেলায় ও সংলগ্ন অঞ্চলে ‘মান’ নামাঙ্কিত বিভিন্ন জনপদ ও জনগোষ্ঠী প্রমাণ করে যে, এখানে এই ‘মান’ রাজবংশ রাজত্ব করেছিলেন। তাঁদের নাম অনুসারেই সম্ভবত এই অঞ্চলের নাম হয়েছিল ‘মানভূম’। আবার অনেকেই মান বংশকে ওড্র জাতির শাখা হিসেবে মনে করেন। ডব্লিউ. বি. ওল্ডহাম এবং এইচ. এইচ. রিজলে মনে করেন যে, মানভূমের নামকরণ হয়েছে দ্রাবিড়ীয় ‘মাল’ কথার অপভ্রংশ থেকে। তাঁরা এও মনে করেন যে সাঁওতাল, মুন্ডা বা আদিবাসীদের দ্রাবিড়ীয় শব্দ ‘মাল’, ‘মৌল’, ‘মালার’ এই শব্দগুলির থেকেই কালক্রমে মানভূম শব্দের উৎপত্তি ঘটেছে।

আবার বাঁকুড়া জেলার রাইপুর অঞ্চলেও ‘মানছাত্রী’ নামে একটি জনজাতি আজও বসবাস করে। মেদিনীপুর জেলার প্রাচীন নাম ‘মানা’; পুরুলিয়া জেলার মানবাজার ও পুঞ্চা থানার এবং বাঁকুড়ার খাতড়া থানার বহুগ্রামে ‘মানা’ নামে এক অনার্য বাউরী সম্প্রদায়ের জনজাতি বসবাস করে। সুতরাং ‘মান’ রাজবংশের থেকে যদি ‘মানভূম’ নাম এসেছে ধরে নেওয়া হয় তাহলে এই নাম ছয়-সাত শতাব্দী থেকে চালু হয়ে আসছে। উনিশ শতকের শেষ দিকেও মানবাজারের রাজারা নিজেদের ‘মানবীনাথ’ বলে পরিচয় দিতেন। আবার উত্তরে বীরভূম দক্ষিনে উড়িষ্যা রাজ্যের ময়ূরভঞ্জ, পূর্বে বাঁকুড়া জেলার মল্লভূম এবং পশ্চিমে বিহার প্রদেশভুক্ত সিংভূম ও নাগভূমের মধ্যবর্তী অরণ্য প্রদেশ ‘ভূম’ যুক্ত অনেকগুলি ছোট ছোট অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। যেমন ‘বরাহভূম’, ‘শিখরভূম’, ‘ধলভূম’ প্রভৃতি। মনে করা হয় ‘মান’দের সঙ্গে ‘ভূম’ যুক্ত হয়ে এই অঞ্চলটি ‘মানভূম’ নামে পরিচিতি লাভ করে।

পূর্বতন ‘জঙ্গলমহল’ জেলা সদর দপ্তর ছিল মানবাজার বা মানভূম খাস। এর থেকেই জেলাটির নাম ‘মানভূম’ হয়ে থাকতে পারে। আবার হান্টারের মতে ‘মানভূম’ ছিল- ‘The land of the wrestlers’ বা মল্লদের বাসভূমি। ‘মল্ল’ শব্দটি থেকেই ‘মল্লভূম’ এবং পরে ‘মন্নভূম’ থেকে ‘মানভূম’ শব্দের উৎপত্তি হয়েছে [ মল্ল>মাল>মান]। সম্ভবত এই অঞ্চলে ‘মল্ল’ বা ‘যোদ্ধারা’ বসবাস করতেন। তা থেকেই মল্লভূম এবং পরবর্তীকালে ‘মানভূম’ নামটি এসেছে বলে অনুমান করা হয়।

তবে ‘মানভূম’ নামের ব্যুৎপত্তি বিষয়ে সবচেয়ে বিশ্বস্ত সূত্রটি মেলে হাজারীবাগের দুধপানি পাহাড়ের গায়ে সংস্কৃত গদ্যে ব্রাহ্মী বর্ণমালায় খোদিত অষ্টম শতাব্দীর একটি গিরিলেখা থেকে। ওই লেখ অনুসারে উদয়মান, ধৌতমান ও অজিতমান- তিন ভাই অযোধ্যা থেকে তাম্রলিপিতে ব্যবসার সূত্রে এসেছিলেন।মগধরাজ আদিসিংহের মন জয় করে উদয়মান একটি গ্রাম লাভ করেছিলেন। সেখানে তিনি মানরাজ্য গড়ে তোলেন। খুব সম্ভব ঐ ‘মান’ রাজ্যই কালক্রমে ‘মানভূম’ হয়েছে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে মানভূম, সিংভূম ও উড়িষ্যার কিয়দংশ এই মানবংশের শাসনাধীন ছিল। এই ‘মানবংশ’ থেকেই ‘মানভূম’ নামের উৎপত্তিকেই সঠিক বলে মনে হয়।

jhumur1

আবার দ্রাবিড় ভাষায় বহু প্রচলিত শব্দ হলো ‘মান’- যার অর্থ হরিণ। টোটেম হিসাবেও জাতিবাচক। এই অঞ্চলের অধিবাসীদের অসভ্য-বর্বর বলেও চিহ্নিত করা হয়েছে। বিভিন্ন পুরাতন গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে এখানকার অধিবাসীরা লুটতরাজ চালাত এবং সাপ ও সমস্ত পশু-পাখির মাংস ভক্ষণ করতো। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতকে মহাবীর জৈন ধর্ম প্রচার করতে এসেছিলেন এই অঞ্চলে (পশ্চিম রাঢ়ে)। তাঁর এই পরিভ্রমণকালে এখানকার অসভ্য লোকেরা তাঁর পিছনে কুকুর লেলিয়ে দিয়েছিল। এই রকম তথ্য পাওয়া যায় আচারঙ্গসূত্তে। অর্থাৎ এখানকার অধিবাসীরা ছিল অসভ্য-অমার্জিত, রূঢ় প্রকৃতির মানুষ। মার্জিত রুচি, আচার-ব্যবহারের কোনো ছাপ ছিলনা পশ্চিম রাঢ়ের এই জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে। তবে এই সমস্ত তথ্য সবই আর্য সংস্কৃতি সম্পন্ন ব্যক্তিদের প্রদেয়। তাঁরা বরাবরই এখানকার আদিবাসীদের অবজ্ঞার চোখে দেখত। আসলে যে গোষ্ঠী, সম্প্রদায় বা শাসকশ্রেণী সমাজে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে সমাজ প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করে ইতিহাসের ঘটনাপ্রবাহকে অনেকটা তাঁরা তাদের মত করে লিপিবদ্ধ করে। মনে হয় ‘মানভূমে’র ক্ষেত্রেও তার ব্রাত্যয় ঘটেনি। পরবর্তীকালে কৃষি ও শিল্পের বিকাশ ঘটে। ধীরে ধীরে আদিবাসীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন রাজাদের ভূমিদানের ফলে বিভিন্ন স্থানথেকে নানা উচ্চবর্ণের সম্প্রদায়ের আগমন ঘটে। এই উচ্চবর্ণের আগমন যে এখানকার অধিবাসীদের লৌকিক ও আত্মিক জগৎ ও জীবনকে খুব বেশি প্রভাবিত করেছিল তা অনেক সমালোচকই মনে করেন না। কিন্তু প্রাচীন মানভূমের ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। কারন প্রাচীন মানভূমের বিশেষত্ব ছিল সমন্বয়বাদ। মানভূম অঞ্চল ছিল বাংলাদেশে আর্যসভ্যতা বিস্তারের প্রবেশপথ। এখানকার অধিবাসীদের আচার-অনুষ্ঠান, ক্রিয়াকর্ম ইত্যাদি ব্রাহ্মণ্যধর্মের পৃষ্ঠপোষকগণ নিজেদের মধ্যে গ্রহণ করেছিল। অপরদিকে ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনেক কিছু আচার-অনুষ্ঠান এমনকি ভাষাও (বাংলা) এখানকার অধিবাসীরা গ্রহণ করেছিলেন। এমনকি মুন্ডা জাতিরা ‘মুন্ডারী’ ভাষা পরিত্যাগ করে বাংলা ভাষাকে নিজেদের মাতৃভাষা হিসেবে গ্রহণ করেছিল। এই ভাবেই আর্য-অনার্য সংস্কৃতির মিলনের ফলেই এখানকার অধিবাসীদের সাংস্কৃতিক মান ক্রমশ উন্নত থেকে উন্নততর হয়েছে। তবে একথা ঠিক যে, এখানকার অধিবাসীরা আচার অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে আর্য প্রভাবকে অনেকখানি এড়িয়ে গেছে; আর সেই কারণেই এখানকার জনগোষ্ঠী তাদের নিজস্ব বৈশিষ্ট্য আজও স্বতন্ত্র হয়ে আছে।

নৃতাত্ত্বিকেরা পৃথিবীর যাবতীয় মানুষকে কয়েকটি নরগোষ্ঠীতে ভাগ করেছেন। বিভিন্ন নামকরণের মানদণ্ড হিসেবে তাঁরা রক্তের গুনাগুন এবং শারীরিক সাদৃশ্যের ওপর নির্ভর করেছেন।এর উপর ভিত্তি করেই তাঁরা বিশুদ্ধ ভূমধ্যীয়, অ্যাল্পীয় বা আদিঅস্ট্রেলয়েড, ইত্যাদি নরগোষ্ঠীতেবিভক্তকরেছেন।তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে মানবসমাজে বিশুদ্ধ Race (নরগোষ্ঠী)-এরঅস্তিত্ব একান্তই অনুমানভিত্তিক (Hypothetical); এর বাস্তব অস্তিত্ব কোথাও কখনও ছিল, এরকম কোন প্রমানিক তথ্য নেই।এমনকি নরগোষ্ঠীর বিশুদ্ধতা নিয়েও সন্দেহআছে নৃতাত্ত্বিকদের মধ্যে।

নৃতাত্ত্বিকদের মতে বাংলার নিম্নবর্ণের সম্প্রদায় এবং আদিম অধিবাসীদের ভিতর যে Race (নরগোষ্ঠী) এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি তা হল- আদিঅস্ট্রেলীয় (Proto- Austroloid)।এই আদি অস্ট্রেলীয়দের সঙ্গে রক্তের সংমিশ্রণ ঘটেছিল পূর্বতন নিগ্রোবটুদের।আবার মানভূম তথা রাঢ় অঞ্চল ছিল সাঁওতাল, ভূমিজ, মুন্ডা, বাঁশফোঁড়, মালপাহাড়ী প্রভৃতি নিম্নবর্ণের আদিম অধিবাসী অধ্যুষিত।সুতরাং মানভূম অঞ্চলে যে আদিঅস্ট্রেলীয় নরগোষ্ঠীর বসবাস ছিল এ বিষয়ে সন্দেহের কোন অবকাশ নেই।

দক্ষিণ ভারতের সমতল প্রদেশ তামিল ভাষাভাষী মানুষ দ্বারা অধ্যুষিত।তারা ‘ভারতীয়মেলানিড’ নরগোষ্ঠীরবংশধর।কোল-মুন্ডা নরগোষ্ঠীর সাথে দ্রাবিড় ভাষী ‘মেলানিড’ নরগোষ্ঠীর মিল আছে বলে মনে করা হয়।৯ রিজলি সাহেবও সাঁওতাল, মুন্ডা, ভড়, দোসাদ, কৈবর্ত, মাল, মালো, মাহালী, রাজোয়াড় প্রভৃতি নিম্নবর্ণের সম্প্রদায়গুলিকে দ্রাবিড়দের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বলে মনে করেছেন।১০ তবে এই সমস্ত সনাক্তীকরণ বহুলাংশে অনুমানভিত্তিক।কেবলমাত্র গায়ের রং এবং চেহারায় কিঞ্চিৎ মিল ছাড়া কোনো সাদৃশ্যের প্রমাণ পাওয়া যায়নি।ভাষা ও সামাজিক ক্ষেত্রে যেটুকু স্বাতন্ত্র্য ছিল সেগুলি ক্রমশ বিলীয়মান।কারণ যে কোন নরগোষ্ঠীর মানুষ কোন সময় যে নির্দিষ্টস্থানে বসবাস করে সেই কাল ও স্থানের পরিবেশ, রীতি পদ্ধতি অনুযায়ী জীবনাচরণে অভ্যস্ত হতে থাকে; অনেক সময় অন্য নরগোষ্ঠীর সম্মুখীনহয়, ধীরে ধীরেরক্ত ও ভাষার মিশ্রণ ঘটে।এইভাবেসমাজঅর্থনীতিএবংসাংস্কৃতিকপ্রভাবেওইনরগোষ্ঠীক্রমশপরিবর্তিতহতেহতেতারনিজস্বস্বাতন্ত্র্যকেহারিয়েফেলে।মানভূমেরক্ষেত্রেওতারব্যতিক্রমঘটেনিবোধহয়।

-: :-

ভাষা হচ্ছে কতকগুলি অর্থবহ ধ্বনিসমষ্টির বিধিবদ্ধরূপ যার সাহায্যে একটি বিশেষ সমাজের লোকেরা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে। কোন জনগোষ্ঠীর মানুষ যখন একইধরনের ধ্বনিসমষ্টির বিধিবদ্ধরূপের দ্বারা নিজেদের মধ্যে ভাব বিনিময় করে, ভাষাবিজ্ঞানীরা তাকে একটি ‘ভাষা-সম্প্রদায়’ (Speech Community) বলেন।১১ আবার বেশিসংখ্যক মানুষ যখন কোনো ভাষায় কথা বলে তখন সেই ভাষার উপাদানগুলিকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, অঞ্চলবিশেষে বা গোষ্ঠীবিশেষে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পাল্টে যায়। অর্থাৎ একই ভাষার বিভিন্ন রকমফের দেখা যায়। ভাষার এই রকমফেরকেই বলে উপভাষা (Dialect)। বাংলা ভাষাও তার ব্যতিক্রম নয়। বাংলা ভাষার মূল পাঁচটি উপভাষার অন্যতম হল ‘ঝাড়খন্ডী’। আবার দীনেশ চন্দ্র সেনের মতে, “বৃহৎ বঙ্গের পশ্চিম সীমানা ছোটনাগপুরের কান্তারভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত”।১২ পশ্চিমে রাজমহল পর্বতমালা এবং দক্ষিণ অভিমুখে বাঁকুড়া-মেদিনীপুর হয়ে সুবর্ণরেখা নদী পর্যন্ত ভূ-ভাগকে বাংলা ভাষার ভাষিক সীমানার দুটি দিক হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে।এই দুই সীমানার মধ্যবর্তী দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তিক অঞ্চলকে ‘পশ্চিম রাঢ়’ বলা হয়ে থাকে।১৩ আচার্য সুকুমার সেন এই এলাকার মানুষের মুখের ভাষাকে ‘ঝাড়খন্ডী’ উপভাষা বলেছেন। তাঁর মতে দু-তিনটি উপভাষার সমষ্টিতে গড়ে উঠেছে ‘ঝাড়খন্ডী’ উপভাষার মূল কাঠামোটি। “মানভূমের ভাষা মানভূঁইয়া ঝাড়খন্ডী উপভাষাগুচ্ছের অন্তর্গত”।১৪ ধীরেন্দ্রনাথ সাহা ঝাড়খন্ডীকে তিনটি ভাগে ভাগ করেছেন- উত্তরা, দক্ষিণী, পূর্বী। উত্তরাকে তিনি মানভুঁইয়া বলেছেন।১৫ উত্তরা পরবর্তীকালে ‘শিখরভূঁইয়া’ নামে পরিচিতি লাভ করে। প্রাচীন ‘শিখর ভূঁইয়া’ পাঁচটি রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ধীরেধীরে তা ‘মানভূম’ নামে আত্মপ্রকাশ করে। ক্যুপল্যান্ড এই অঞ্চলের মানুষের ভাষাকে বলেছেন- “The prevailing vernacular of the district is the western dialect of the Bengali, known as ‘Rahiboli’ “।১৬

jhumur2

মানভূম বাংলাভাষিক প্রান্তীয় এলাকা এবং মানভূমের ভাষাও বাংলা ভাষারই একটি প্রান্তীয় উপভাষা। নানাঘাত-প্রতিঘাত, আক্রমণ-প্রতি আক্রমণের ফলে মানভূমের রাজনৈতিক মানচিত্রের পরিবর্তন ঘটে। ফলতঃকেন্দ্রীয় ভাষারাঢ়ীর থেকে এর দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে থাকে বাংলার পাশাপাশি কুর্মালি এবং খোট্টা ভাষার চলও এখানে লক্ষ্য করা যায়। ক্যুপল্যান্ডেরমতে- “Along the western border this merges into the Magahi from of Hindi, variants of which are locally known as Kurmali, Khotta or Khottahi”।১৭ মুন্ডা গোষ্ঠীর মানুষেরা কুর্মালিভাষাকে ‘সেদানী’ (সাদানি) বলতেন। কেন না অঞ্চল ভেদে বা জনগোষ্ঠীর পার্থক্যে মূল ভাষার রূপ বদলে গেলেও মূলকাঠামোটি অপরিবর্তিত থাকে। কুর্মালি ভাষা” পাঁচপরগণিয়াওনাগপুরিয়া” নামেও পরিচিত।১৮ ‘নাগপুরিয়া’ বলা হত হাজারীবাগে এবং রাঁচির পাঁচপরগণায় ‘পাঁচপরগণিয়া’ বলা হত। আবার পাঁচপরগণিয়া ভাষা বলতে সাধারণভাবে বাংলা, হিন্দি, সাঁওতালি, ভোজপুরি ও মৈথিলীর এক মিশ্রবুলি বোঝায়। কারো কারো মতে হিন্দির অপভ্রংশ মগহি প্রভাবিত পাঁচপরগনার ভাষাইখানিকটা বিকৃত হয়ে খোট্টাবাখোরঠাতে রূপান্তরিত হয়েছে।১৯

কিছুকাল আগে পর্যন্ত ‘খোরঠা’র গোত্র বিচার নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে সংশয় ছিল। সেই সময়ে যারা জনগণনা করেছিলেন তারাও ঠিক করতে পারেননি যে ‘খোরঠা’ হিন্দি না বাংলার অপভ্রংশ রূপ অথবা বাংলা নাম গহির উপভাষা। ১৯০১ সালের জনগণনাতে ‘খোরঠা’, ‘কুর্মালি’, ‘খোট্টাবাংলা’ নামে চিহ্নিত করা হয়েছে। ১৯১১ সালের আদমশুমারির রিপোর্ট বেরোনোর আগেই ১৯১২ সালে মানভূমকে বিহারপ্রদেশের সাথে জুড়ে দেওয়া হয়। ১৯১৩ সালে যখন ১৯১১ সালের সেনসাস রিপোর্ট প্রকাশিত হলো তখন, একজায়গায় ‘খোরঠা’কে বলা হলো ‘মগহি হিন্দির অপভ্রংশ’, আর এক জায়গায় ‘খোট্টা বাংলা’।এমনকী ১৯২১ সালের সেনসাস রিপোর্টেও একই কথা বলা হয়েছিল।মানভূম বিভাজনের আগে যে দুটি জন গণনা হয়েছিল তার রিপোর্টে হিন্দি সাম্রাজ্যবাদীরা ‘খোরঠা’ ভাষীদের ‘হিন্দিভাষী’ বলে চালিয়ে দেওয়ার একটা ব্যর্থ প্রয়াস করেছিলেন। কিন্তু ‘খোরঠা’ আজস্বতন্ত্রভাষার দাবিদার। কোন একটি কথ্যভাষার ( বুলির) সমৃদ্ধ ভাষা হয়ে ওঠার জন্য শর্তপূরণ করার ক্ষমতা  ‘খোরঠা’র নিজস্বতা বর্তমান। ‘খোরঠা’র ঝুমুর গান অত্যন্ত জনপ্রিয়।এই ভাষাতে সাহিত্য রচনা করে অনেকে সুনাম অর্জন করেছেন।২০

আবার  ‘কুর্মালি’ ভাষার ভাষিক এলাকাটিও ছিল বিস্তৃত। অযোধ্যা পাহাড়ের পশ্চিম দিক বরাবর ঝালদা, বাগমুন্ডি, ইচাগড়, নিমডি প্রভৃতি অঞ্চলের মানুষ ‘কুর্মালি’ ভাষায় কথা বলত। লিপি-বিহীন প্রাকৃত ভাষাটির ব্যবহারিক লিপি বাংলা এবং দেবনাগরী, কখনো কখনোও ড়িয়ালিপিতে লেখা হতো বলে জানা যায়।লিপিবিহীনপ্রাকৃতভাষাটিরনিজস্ববর্ণমালাছিলকৈথি।২১ কুর্মালিতে বহুবিদ্বজন মানুষ নানা গ্রন্থ, কাব্য, নাটক ইত্যাদি রচনা করেছেন অনায়াসে। বর্তমানে কুর্মালি ভাষা সিধু কানু, রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বীকৃতপ্রাপ্ত। আবারকুর্মালিওখোরঠার সঙ্গে মানভূঁইয়া বাংলার সাদৃশ্যের কথা অনেকেই বলে থাকেন। কারণ একটি সমৃদ্ধ ভাষার প্রত্নতাত্ত্বিক নানা নিদর্শন তার প্রান্তীয় উপভাষাগুলিতে থেকে যায়। কুর্মালিও মান ভূঁইয়া দুটিই প্রান্তীয় ভাষা। উভয়ের অবস্থান পাশাপাশি, উভয় উপভাষাই পূর্ব ভারতের দুটি প্রতিবেশী নব্য ভারতীয় আর্যভাষার উপভাষা, একটি মগহির, অপরটি বাংলার।২২ ভাষা নদীর মতোই গতিশীল, প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। কুর্মালিওখোরঠা, পাঁচপরগণিয়া, সাদানা বা মানভূঁইয়া- এই সমস্ত ভাষাই মানভূম তথা ছোটনাগপুরমাল ভূমি অঞ্চলের প্রাচীন জনগোষ্ঠীর ( অস্ট্রিক- দ্রাবিড়) ভাষা। আবার ভাষার মধ্যেই সেই জাতির অতীত উপাদান নিহিত থাকে। স্বাভাবিকভাবেই মানভূমের উপরোক্ত ভাষাগুলিও তার ব্যতিক্রম নয়।

বর্তমানে দূরদর্শন, চলচ্চিত্র, বেতার, সংবাদপত্র, পত্রপত্রিকা এবং সামাজিক চলমানতার (Movement/Mobility) ফলে আঞ্চলিক ভাষা ভেদ ক্রমশ মুছে যাবে বলেই আমাদের ধারণা। ঐতিহ্যের প্রতি অনুরাগ থাকাটা অবশ্যই গর্বের বিষয়। কিন্তু অত্যধিক অনুরাগ দেখা দিলে সেটা আত্মহননেরই সামিল”।২৩ তাই উপভাষার প্রতি দুর্বলতাবশতঃ অশ্রুপাত না করে নিরন্তর চর্চা চালিয়ে যেতে হবে। সমাজের সক্রিয় এবং সচেতন প্রয়াস ছাড়া কোনো উপভাষাই উচ্চমর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না।প্রণয়ন করতে হবে বিজ্ঞান সম্মত ভাষানীতি।সরকারের পৃষ্ঠপোষকতার বিষয়টিও একান্ত জরুরী। বহুপ্রাচীন এই উপভাষাকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য রাঁচী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো পশ্চিমবঙ্গের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় এগিয়ে আসবে বলে আমাদের ধারণা।

 

 

-:: তথ্যসূত্র ::-

১।পশ্চিমবঙ্গদর্শন – ৩ , পুরুলিয়াঃতরুণদেব ভট্টাচার্য, ফার্মাকে.এল.এম. প্রাইভেটলিমিটেড, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০১২, ২০১৪ (তৃতীয়প্রকাশ),পৃষ্ঠাঃ৯-১২।

২। Bengal District Gazetteers ‘Manbhum’ :   H. Cupland, Bengal Secretariat Book Dept, Calcutta, 1911,Page- 1.

৩।পশ্চিমবঙ্গদর্শন – ৩ , পুরুলিয়াঃ  তরুণদেব ভট্টাচার্য, ফার্মাকে.এল.এম. প্রাইভেটলিমিটেড, বিপিনবিহারী গাঙ্গুলী স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০১২, ২০১৪ (তৃতীয় প্রকাশ),পৃষ্ঠাঃ১২।

৪। Bengal District Gazetteers ‘Manbhum’ :   H. Cupland, Bengal Secretariat Book Dept, Calcutta, 1911,Page- 1.

৫।ধানবাদ ইতি বৃত্তঃঅজিত রায়, শহর পাবলিকেশন, হীরাপুর, ধানবাদ, ঝাড়খন্ড,  ২০০৭ ( দ্বিতীয় সংস্করণ), পৃষ্ঠাঃ১২।

৬।মানভূমের বাংলা ভাষা প্রসঙ্গঃ ডঃভীমসেন মাহাতো, জি. পালুই, ২৯/২ বেনিয়াটোলালেন, কলকাতা – ৭০০০০৯, ২০১৪ (প্রথম প্রকাশ), পৃষ্ঠাঃ৩৩।

৭।বাঙালির ইতিহাস (আদিপর্ব):  নীহাররঞ্জন রায়, সুধাংশুশেখর দে, দে’জ পাবলিশিং,১৩ বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০৭৩, ১৩৩৭                              ( সংযোজিত সাক্ষরতা সংস্করণ), পৃষ্ঠাঃ৮০-১১২।

৮।ঐপৃষ্ঠাঃ৭৫-৭৬।

৯।ঐপৃষ্ঠাঃ৮০-৮১।

১০।ঐপৃষ্ঠাঃ৭০-৭৩।

১১।সাধারণ ভাষাবিজ্ঞান ও বাংলাভাষাঃ                ডঃরামেশ্বর শ, অনুপকুমার মাহিন্দার, পুস্তক বিপণি,                     ২৭বেনিয়াটোলা লেন, কলকাতা – ৭০০০০৯, ১৪০৩                   (তৃতীয় সংস্করণ), পৃষ্ঠাঃ৬৪৫।

১২।বৃহৎবঙ্গ (প্রথম খন্ড):                                  দীনেশচন্দ্র সেন, সুধাংশুশেখরদে, দে’জ পাবলিশিং,                    ১৩বঙ্কিম চ্যাটার্জিস্ট্রিট, কলকাতা – ৭০০০৭৩, ২০১৬                 ( চতুর্থ সংস্করণ), পৃষ্ঠাঃ১৫।

১৩।মানভূমেরবাংলাভাষাপ্রসঙ্গঃ               ডঃভীমসেন মাহাতো, জি. পালুই, ২৯/২বেনিয়াটোলা                 লেন, কলকাতা – ৭০০০০৯, ২০১৪ (প্রথমপ্রকাশ),                    পৃষ্ঠাঃ৫৪।।

১৪।ভাষার ইতিবৃত্তঃ সুকুমার সেন, সুধীর কুমারমিত্র, আনন্দ পাবলিশার্স     প্রাইভেট লিমিটেড, ৪৫বেনিয়াটোলা লেন,কলকাতা- ৭০০০০৯, ১৯৯৩ ( প্রথম সংস্করণ), পৃষ্ঠাঃ১৪৮-১৪৯।

১৫।ঝাড়খন্ডী বাংলার উপভাষাঃ                ধীরেন্দ্রনাথ সাহা, রাঁচি বিশ্ববিদ্যালয়, রাঁচি ১৯৮৩  (প্রথম              প্রকাশ), পৃষ্ঠাঃ৩৯।

১৬।Bengal District Gazetteers ‘Manbhum’ : H. Cupland, Bengal Secretariat Book Dept, Calcutta, 1911,Page- 72 .

১৭।ঐপৃষ্ঠাঃ৭২।

১৮।কুর্মালিভাষাতত্ত্বঃ                             ক্ষুদিরাম মাহাত, কুঞ্জেশ্বরী প্রেস, নীলকুঠি ডাঙ্গা,                                  ১৩৮০ (প্রথমপ্রকাশ), পৃষ্ঠাঃ২-৬।

১৯।ধানবাদ ইতিবৃত্তঃ অজিত রায়, শহর পাবলিকেশন, হীরাপুর, ধানবাদ, ঝাড়খন্ড, ২০০৭ ( দ্বিতীয় সংস্করণ), পৃষ্ঠাঃ১৫১-১৫২।

২০।ঐপৃষ্ঠাঃ১৫২-১৫৩।

২১।মানভূমের বাংলা ভাষা প্রসঙ্গঃ             ডঃভীমসেন মাহাতো, জি. পালুই, ২৯/২ বেনিয়াটোলা                লেন, কলকাতা – ৭০০০০৯, ২০১৪ (প্রথম প্রকাশ),                   পৃষ্ঠাঃ১০৮।

২২।ঐ পৃষ্ঠাঃ১০৯।

২৩।ঐ পৃষ্ঠাঃ১০৯।

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nine − 7 =

You might also like...

rsp

প্রচারহীন রাজ্য সম্মেলন, মিডিয়ার উপেক্ষা না অজ্ঞতা?‌

Read More →
error: Content is protected !!
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk