Loading...
You are here:  Home  >  কলকাতা  >  Current Article

‌একটি রাত – একা উত্তম কুমার

By   /  July 24, 2020  /  No Comments

অম্লান রায়চৌধুরী

একা একা থাকাটা বা থাকার ইচ্ছাটা প্রায় সব সেলিব্রেটিরই স্বপ্ন। কারণ, তাঁদের একা থাকার সুযোগটা বড়ই কম। শুনেছি ভারতের নামী শিল্পপতিরা নাকি বিদেশে গিয়ে একা রাস্তায় হাঁটেন, পার্কে যান, গিয়ে বসেন নিজের ইছা মতন কিছু কিনে খান – যেখানে কেউ তাঁদের চেনে না, কোনও ভীড় হয় না। এটা তাঁদের কাছে একটা বড় প্রাপ্তি।

উত্তম কুমারের মতো একজন অত বড় মাপের সেলিব্রেটি – জনপ্রিয়তার শেষ কথা, তাঁরও একটু একা থাকার স্বাদ হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক। সেই ভাবনা থেকেই তাঁকে স্মরণ রেখে এই নিবন্ধ।

একা থাকার শুরুটা সেই টালিগঞ্জের ওই উঁচু জায়গাটা। যেটাকে ছেড়ে নেমে এলেন নীচে রাস্তায়। নিশুত রাত। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখলেন, এত রাতেও কেউ কোথাও আছে কি না। এমনিতেই ঘন বর্ষার মরশুম। লোকজনের চিহ্নও দেখা যাচ্ছে না। চারিদিক শুনশান দেখে বেশ হালকা লাগল তাঁর। কতদিন যে খোলা হাওয়ায় হাঁটেননি তিনি। লোকের ভিড়, আলোর দুনিয়া অহোরাত্র তাঁকে ঘিরে রেখেছে।

murti1

কেউ বুঝতেও পারেনি, এই আলোর সংসারও তাঁকে শেষমেশ কিছু যন্ত্রণাও দিয়েছে। তাঁর মনে পড়ছে, একদিন জগুবাবুর বাজার থেকে একটা গোলাপ ফুল কিনতে চেয়েছিলেন তিনি। স্বয়ং তিনিও গোলাপটি চেয়ে পাননি। কেননা, নিজে না নেমে ড্রাইভারকে নামিয়েছিলেন। ড্রাইভার সঠিক ফুলটি আনতে পারেননি। একা কেনার স্বাদটা মিটল না। আর তিনি নিজে নামলে? সে এক কাণ্ডই হত বটে।

আবার মনে পড়ল, বেশ কিছ দিন আগের কথা, এক আত্মীয়ের বিয়েতে অত রাতেও গিয়ে সে কী ভিড়ের মধ্যে পড়তে হয়েছিল। এই যে ঘেরাটোপের মধ্যে সারাক্ষণ থাকা, এ কি তাঁকে কষ্ট দেয়নি? দিয়েছে। কিন্তু বুঝেছে ক’জন? আর এসব না থাকলেও যে নয়।

একবার বম্বের এক পরিচালক জানতে চেয়েছিলেন, কেন তাঁর পারিশ্রমিক এত বেশি। সোজা নিয়ে চলে গিয়েছিলেন মেয়েদের একটি স্কুলের সামনে। গাড়ি থেকে নেমে সবে সিগারেট ধরিয়েছেন, অমনি হু হু করে ভিড়। আর কিছু বলতে হয়নি। পরিচালকের যা বোঝার বুঝে গিয়েছিলেন।

সেবার বন্যার সময় মায়েরা-বোনেরা যে গায়ের গহনা খুলে দিয়েছিলেন সে তো তাঁকে দেখেই। তিনি তো তাই সবাইকেই বলতেন, নায়কদের এত প্রকাশ্যে আসতে নেই। একবার শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়কে দেখেছিলেন পেট্রোল পাম্পে দাঁড়িয়ে তেল ভরাচ্ছেন গাড়িতে। শুভেন্দুকে পরে বলেছিলেন, আরে ছায়াছবির লোক যদি নাগালেই থাকবে, তাহলে আর নায়কোচিত ইমেজটির কী হবে? নিজে সেদিন বারণ করেছিলেন।

আসলে নায়ক হওয়া, জনপ্রিয়তার অমৃত পান, একরকম নীলকণ্ঠ হওয়া। এই ইমেজটা উনি বয়ে নিয়ে গেছেন শেষ দিন পর্যন্ত। জানি না আজকের এই মিডিয়া অধ্যুষিত সমাজে ওটাকে উনি কীভাবে রাখতেন।

আজ অনেকদিন পর ফাঁকা রাস্তায় হাঁটতে পেরে ভালেই লাগছে। ফুরফুরে লাগছে। গুণগুন করে একটা গান গাইতে ইচ্ছে করছে। তাঁরই ছবির …… এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হত? কে জানে কেমন হত, পেছনে ফিরে একবার নিজের মুর্তিটিকে দেখলেন।

ভাবতে ভাবতে চলেছেন, কত দাপুটে অভিনেতাকেই তিনি দেখেছেন। ছবি বিশ্বাস, পাহাড়ি সান্যাল। বাপরে বাপ, কী স্ক্রিন প্রেজেন্স তাঁদের। তারপর তাঁর তুলসীদা, মানে তুলসী চক্রবর্তী। উফফ কী স্বাভাবিক অভিনয়টাই না করতে পারতেন। বিকাশ রায়! কি কন্ঠস্বরের ওঠা পড়া আর সেই শরীরি অভিব্যাক্তি – পর্দা মাত করে দিতেন। আরও কত তুখোড় অভিনেতা বাংলায় ছিলেন, আছেন, থাকবেন। কিন্তু সকলেই তিনি নন। উনি নিজেই অবাক যে কী করে যেন তিনি একটু একটু করে মহানায়ক হয়ে গেলেন।

উনি ভাবছেন, যখন অভিনয় জীবন শুরু করেছেন, সেটা ছিল বাংলা সমাজ ও রাজনৈতিক জীবনে একটা সন্ধিকাল। দীর্ঘ ব্রিটিশ শাসন শেষ। সবে স্বাধীন হয়েছে ভারত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী কালে ভেঙেচুরে যাচ্ছে পুরনো মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক জীবনেও নেমে আসছে একটা বড় পরিবর্তন। মধ্যবিত্ত বাঙালির যৌবনের চিন্তাধারা, সমাজচেতনা তখন পাল্টে পাল্টে যাচ্ছে, তৈরি হচ্ছে এক নতুন আশার ভিত্তিভূমি। এই সব কিছুর সঙ্গেই, সমাজ ও অর্থনৈতিক জীবনের সঙ্গেই বদলে যাচ্ছে প্রেমের ধরণটাও। আর সেই পরিবর্তমান প্রেমের ধারণা খুঁজে বেড়াচ্ছিল এক নতুন ‘রোম্যান্টিক আইডল’কে। বাঙালি যৌবনের সেই ‘রোম্যান্টিক আইডল’ খুঁজে বেড়ানোটা যেন খানিকটা দিশা পেল তাঁকে পেয়ে। তবেই না উনি আজও বাঙালির স্মৃতিবিলাসের ‘ম্যাটিনি আইডল’, পূজার ছলে আমরা যাঁকে ভুলেই থাকি।

এটাও সত্যি যে, তাঁর কোনও বিরাট ক্ষমতা ছিল না, ছিল না কোনও সংস্থার সমর্থন, যেমন ছিল না তাঁর চরিত্রদেরও। সাধারণ থেকেও অসাধারণ হয়ে ওঠার যে ক্ষমতা ছিল তাঁর চরিত্রদের, তাই বোধহয় ছিল একটা গোটা জাতির প্রত্যাশা।
তিনি এখন বুঝতে পারছেন যে তিনিই ছিলেন সেই সব চাহিদার প্রতিনিধি। আর সামাজিক চৌহদ্দির ভিতর বাস্তবতা যা পূরণে অপারগ ছিল, তিনি তা বিকল্প বাস্তবতায় সম্ভব করে তুলতে পারতেন।

cover2

এ তো ইতিহাসের নায়করা করতে পারেন না। এর জন্য খোঁজ পড়ে ইতিহাসের প্রসারিত সীমায় ইতিহাস তৈরি করা এক মানুষের। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তাঁর এই চিরকালীন জনপ্রিয়তার একটি বড় কারণ তাঁর বাঙালিয়ানার প্রতীক। বাঙালিয়ানার প্রতীক বলতে তাঁর সুদর্শন চেহারা বা ধুতি-পাঞ্জাবি পরা নজরকাড়া ব্যক্তিত্বই শুধু নয়। তিনি ছিলেন বাঙালি সত্ত্বার এক সম্পূর্ণ ‘প্যাকেজ’ । তাঁর সমকালীন সময়ে তৈরি হওয়া বাংলা ছবিতে তিনি দারুণভাবে মিশ খেয়ে যেতেন তাঁর ব্যক্তিত্ত্ব, হাসি, সম্পূর্ণ ভাবমূর্তিই।

সাবেকি বাঙালি দর্শকের কাছে ছবিতে বৈষয়িক আতিশয্যের আবেদন ছিল না সেভাবে। বরং তাঁদের বেশি ভাল লাগত সহজ জীবন দর্শন এবং যাপন; মেধার কদর; সরল রোম্যান্টিকতা; শ্রুতিমধুর গান এবং দৃষ্টিমধুর অভিব্যক্তি। এই সমস্ত জোগান তখনকার দিনের পরিচালকরা দিলেও তা পর্দায় নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি দুর্দান্ত মাধ্যমের আর সেই কাজটিতে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত ।

এই প্রসঙ্গে হঠাৎই মনে এল তাঁরই প্রিয় নায়ক মারচেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নির কথা। যাঁকে উনি অনেকাংশেই অনুসরণ করার চেষ্টা করতেন। শুনেছি স্ক্রিপ্টের খাতিরে একবার মারচেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নিকে বলতে হয়েছিল ‘আমি ইউরোপের সব থেকে রূপবান পুরুষদের একজন’ (অ্যান এত্তারো দি চিয়েলো, ১৯৫৯ ) – শুধু মাত্র কথার কথা হিসাবে কথাটা ঢোকানো হয়নি, বুঝতেই পারছেন, কথাটার যৌক্তিকতাটা কতটা। শুধু মাত্র সমাপতন হিসাবে দেখলে চলবে না।

সে যুগে যা হত আর কী, লোকজন সেক্স অ্যাপিল ট্যাপিলের কথা শুনেছে, ব্রিজেট বারদো কি সুপ্রিয়াকে নিয়ে সেসব ভাবলেও নায়কদের জন্য থাকত একটা সম্ভ্রম মেশানো তারিফ! কী রূপ দেখেছ? পুরুষ–‌মহিলা নির্বিশেষে এই দেহজ সৌন্দর্যকে খানিকটা প্লেটোনিক অ্যাঙ্গল থেকেই দেখে এসেছেন এটা ঠিকই। কিন্তু এই সৌন্দর্যকে কখনও কি ভয়ঙ্কর টেক্সটবুক পুরুষালী বলে মনে হয়েছে। আদপেই নয়, নায়কদের–ও যে একটা প্রশংসনীয় কমনীয়তা থাকতে পারে, সেটা বোঝানোর জন্য বোধহয় সব সেরা উদাহরণ উত্তম এবং মারচেল্লো। হয়ত সেজন্যই রোম্যান্টিক নায়ক হিসাবেও দুজনে অত্যন্ত সফল।

মারচেল্লো মাস্ত্রোইয়ান্নি র ‘লা দোলচে ভিটা’ কিংবা ‘ডিভোর্স, ইটালিয়ান স্টাইল‘ দেখার পর অনেকেই কেমন যেন তাঁর গন্ধ পেয়েছিলেন সারা ছবিতেই। বিস্তর আলোচনাও হয়েছিল। তুলনামুলক ভাবে ভাবতে গেলে সাবকনসাস মাইন্ডে একটা ধাক্কা নিশ্চয়ই এসেছে। ওই ছবির সেই সিকোয়েন্স – সিসিলির দুপুরে ঘামে ভেজা ব্যরনের আবির্ভাব পর্দায়। ওটা সিসিলির হিউমিড দুপুর না হয়ে ধর্মতলার প্যাচপেচে বিকালই হোক, পড়তি ব্যারনের জায়গায় না হয় বিশ্বম্ভর রায়ের মতন ঝড়ে পড়া বনেদিই হোক, ফার্স্ট কাজিনের সঙ্গে বিবাহোত্তর অবৈধ প্রেম যদি বাঙালি সংস্কৃতিতে একটু বেশি গুরু মনে হয়, অন্য কিছু ভাবেই না হয় প্রেমটা হোক – তবে ‘বিবাহোত্তর’ ব্যাপারটাকে রাখতেই হবে, তা হলে তাঁকে কেমন লাগত – সেটা নিয়েও আমাদের সঙ্গে তাঁরও ভাবনা ছিল। এ গুলো নিয়ে গভীর ভাবে ভাবা যেতেই পারে। উনি নিজেও ভাবছেন ওই একলা চলার মাঝে।

তিনি বেশ মনে করতে পারছেন, তাঁর মধ্যে একটি সাংস্কৃতিক সিগ্নেচার ছিল যেটা তাঁরই তৈরি ছিল পুরোদস্তুর। অবশ্য এটা উনিও মানছেন যে, সেই সময় উনি একাই এই গুণের অধিকারী ছিলেন, তা নয়। চারিদিকে নানান নামী নামের ছড়াছড়ি। কিন্তু তাঁর ভদ্র নম্র আবেদন দর্শকদের কাছে ছিল বিশেষ প্রিয়। খলনায়ককে পিটুনি দিয়ে নিজের নায়কোচিত পৌরুষ বনা বা আজকের দিনের ‘ম্যাচো’ র ভাব আনতে হয়নি তাঁকে। সেসব না করেও সহজভাবে তিনি ঢুকে গিয়েছেন তাঁর চরিত্রের অন্তরে। এর কারণ, তিনি অভিনয়ের সূক্ষ দিকগুলিকে ওস্তাদের মতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। আর সেই ওস্তাদি শুধুমাত্র প্রতিভা থাকলেই রপ্ত হয় না; তার জন্যে প্রয়োজন অক্লান্ত পরিশ্রম এবং নিষ্ঠা, যা তাঁর ছিল।

আজকের তুলনায় তিনি ছিলেন মান্ধাতার আমলের মানুষ; কিন্তু হারিয়ে যাননি। তিনি বাজার অর্থনীতির প্রযুক্তি নির্ভর কলাকুশলীদের পূর্ববর্তী সময়কার শিল্পী হয়েও আজকের বাজারে জনপ্রিয়তার দৌড়ে হার মানেননি। মানুষ হিসাবে ছিলেন বড় মাপের। সহকর্মীদের আর্থিক বিপদের দিনে পাশে দাঁড়াতেন নিঃস্বার্থভাবে। কাউকে জানতেও দিতেন না।

তাঁর হাঁটা শেষ। এসে থামলেন সেই স্টুডিও পাড়ার কাছে টালিগঞ্জের মোড়ে। ফিরে গেলেন আবার সেই বন্দিদশায় – যেখান থেকে তিনি দেখছেন আজকের শিল্পকলা যেখানে মধ্য, নিম্ন মেধার বাড় বাড়ন্ত – শিল্পের মূল্যায়ন হয় ব্যবসায়িক নিরিখে, অধিকাংশ শিল্পই তাদের শৈল্পিক মূল্য হারিয়ে ফেলেছে কেবলই বিনোদনকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে। দর্শক তৈরি হয়নি, করতে পারেনি আজকের শিল্প কুশলীরা। এসেছে চটক ও সাময়িক ক্ষিধের নিবৃত্তি। তাঁর বিষন্নতা এলেও তিনি তো চুপ হয়ে গেছেন সেই কবে থেকেই ।

তবে শেষে একটা কথা না বলে শেষ করা ঠিক হবে না। উত্তম কুমারকে নিয়ে আমরা নস্টালজিয়ায় ভুগলেও তাঁর লিগ্যাসি বাঁচিয়ে রাখার মতো কাজ কটা করতে পেরেছি?‌ তাঁর অভিনীত প্রত্যেকটি ছবিকেই আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পেরেছি কি? তাঁর নামে একটি মিউজিয়াম বা গবেষণা কেন্দ্রের নাম আজ দিগ্বিদিকে ছড়িয়ে পড়তেই পারত।

সংরক্ষণের সংস্কৃতি আমরা যদি আজও না শিখি তবে আর কবে শিখব?

 

&&&&&&&&&&&&&&&&&&&&&&&&&

 


বেঙ্গল টাইমসের মহানায়ক স্পেশাল।
আস্ত ই–‌ম্যাগাজিন। রয়েছে নানা আঙ্গিকের ১৮ টি লেখা।

পড়তে হলে নিচের লিঙ্কে ক্লিক করুন। প্রচ্ছদের ছবিতেও ক্লিক করতে পারেন। তাহলেও পুরো ম্যাগাজিনটি খুলে যাবে।

http://www.bengaltimes.in/BengalTimes-MahanayakSpecial.pdf

cover1.indd
‌‌

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

13 − 9 =

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

error: Content is protected !!
game of thrones season 7 episode 1 game of thrones season 7 watch online game of thrones season 7 live streaming game of thrones season 7 episode 1 voot voot apk uc news vidmate download flipkart flipkart flipkart apk cartoon hd cartoonhd cartoon hd apk cartoon hd download 9Apps 9Apps apk